Connect with us

গল্প

মাটি || শেলী সেনগুপ্তা

Published

on

মাটি || শেলী সেনগুপ্তা

মাটি || শেলী সেনগুপ্তা

শেলী সেনগুপ্তা

শেলী সেনগুপ্তা

মনোজ মিত্র অপলক চেয়ে আছে। ওর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো যে, তাকে কোন দলে ফেলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। এমন তার বয়স নয় যে তাকে যুবা বলা যায় আবার এমন কিছু কম নয় যে, তাকে কিশোর বলা যায়। সদ্য গোঁফ উঠেছে। অবয়বে একটা কোমল ভাব ছড়িয়ে আছে। মুখটার দিকে তাকালেই বুকের মধ্যে উথাল-পাতাল ঢেউ উঠে। মনে হয় কত দিনের চেনা। নাম অধীশ, কানাডা থেকে এসেছে। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোতে পড়ে। গ্রীষ্মকালীণ ছুটি চলছে। ওর ইচ্ছা এ সময়টা নিউইয়র্কে কাটাবে।

ইদানিং পিয়ানো বাজানো শিখছে। নিউইয়র্কে আসার উদ্দেশ্য ভালো কোন শিকের কাছে পিয়ানো শেখা। মনোজ মিত্রের ছেলে আকাশ মিত্র একজন ভালো পিয়ানোবাদক। এখানে এসেই সন্ধান পেয়েছে। যোগাযোগ করে কথা বলে নিয়েছে। অধীশকে দু’সপ্তাহ পিয়ানো শেখাবে।

প্রতিদিন বিকেল ৩টায় আসবে ৫টা পর্যন্ত পিয়ানো শিখবে। আজ তার প্রথম দিন। ঠিক সময়ে কাস শেষ হলো। সেদিনের মতো বিদায় নিয়ে চলে গেলো।
প্রথম দিন কাস করতে এসে মনোজ মিত্রকে দেখে অধীশ এর মাথা নত হয়ে এলো। প্রণাম করতে ইচ্ছে হলো।

শহরে বেশ সম্ভ্রান্ত এলাকায় গড়ে ওঠা বাড়িটার মালিক মনোজ মিত্র। প্রায় চল্লিশ বছর আগে আমেরিকাতে এসেছে। জীবন ও জীবিকা ওকে আমেরিকা টেনে এনেছে। আমেরিকা আসার পর বেশ কিছুদিন দেশের সাথে বেশ যোগাযোগ ছিলো। ধীরে ধীরে মায়া কেটে গেছে। অনেক দিন আর কারো সাথে কোন সম্পর্ক নেই। বলতে গেলে নিজেই সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। প্রথম প্রথম আত্মীয়রা যোগাযোগ করতে চাইতো। উন্নত দেশের সুফল সবাই পেতে চায়। হয়তো সেটা মনোজ মিত্রের ভালো লাগতো না। তাই সবার সাথে সব সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেছেন।

একটা সময় প্রচুর পরিশ্রম করেছে। রাতদিন বলে কিছুই ছিলো। নিজেকে পাগলা ঘোড়া বানিয়ে জীবন কাঁধে নিয়ে অবিরাম ছুটেছে শুধুই। এখন প্রচুর অর্থবিত্তের অধিকারী হয়েছে। বেশ বড় আঙ্গিনা নিয়ে বাড়ি করেছে। বলতে গেলে অবসর জীবন যাপন করছে।

অধীশ প্রতিদিন পিয়ানো শিখতে আসে। মনোজ মিত্রকে দেখলেই বেশ সম্মান জানায়। আবার সময়মতো চলে যায়।

অধীশ যখন পিয়ানো শেখে মনোজ মিত্র যখন নিজের বাগান পরিচর্যা করেন। কান পেতে শোনেন। মনে মনে ভাবেন, হাত টা বড়ো মিষ্টি। একদিন অনেক বড় বাজিয়ে হবে।

আজকাল এমন হয়েছে, অধীশ আসার সময় হলেই মনোজ মিত্র নিচে নেমে আসে। পিয়ানো শুনতে শুনতে বাগানের কাজ করেন, ভালই লাগে। কখনো এক মগ কফি নিয়ে বারান্দায় বসে থাকেন। সুর শুনতে শুনতে যেন ছোটবেলার দামাল দিনগুলোতে ফিরে যান। সেই যে ঘুড়ির পেছনে ছোটা, ডাংগুলি খেলা। সারাদিন কেটে যেতো খেলায়। সন্ধ্যেবেলা টিচার এর কাছে পড়তে বসলে ঝিমুনি আসতো। মনে পড়ে সেই ছোট্ট মনোজ একটা রুমাল ভিজিয়ে নিয়ে যেতো। মাঝে মাঝে চোখ মুছে নিতো। তাতেও কী কাটে ঘুমের রেশ! খলায় মগ্ন থাকতে থাকতে বাড়ির কাজ আর করা হতো না। যেদিন বাড়ির কাজ বাকি থাকতো সেদিন কয়েকটা শার্ট পরে পড়তে বসতো। যেন মার দিলে ব্যথা না লাগে।

বাসার সামনে ছিলো একটা বরুই গাছ। আসা যাওয়ার পথে শুধু ঢিল ছুঁড়তো। পাড়াময় দুরন্তপনা করে বেড়িয়েই সময় কাটতো। দুরন্তপনা করেই চলে এসেছেন আমেরিকা। দুরন্তপনা করেই আজ আত্মীয়দের কাছ থেকে দূরে সরে গেছ্নে। জানেনা এখন কে কে আছে, কোথায় আছে। অধীশকে দেখলেই দেশের কথা মনে হয়। ওর শান্ত রুপ বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কর্ণফুলী নদীটার কথা মনে করিয়ে দেয়। ওর ভাবালু চোখের মধ্যে ঘরে ফেরার আহ্বান। অথচ যাওয়ার কোন উপায় নেই। কে কোথায় কেমন আছে কিছুই জানা নেই এখন। নিজেই সরে গেছেন সবার কাছ ঠেকে।

কাস শেষ করে চলে যাচ্ছে অধীশ। হঠাত ফিরে এলো। মনোজ মিত্রের সামনে মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে । হঠাৎ মনোজ মিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বললো, ‘ যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা কথা বলি?’

‘সে কি ! মনে করার কি আছে! বলো কী বলতে চাও।’
‘আপনিতো নিউইয়র্কে অনেক দিন আছেন?’
‘তা বলতে পারো চল্লিশ বছরেরও বেশি।’
‘তাহলে তো এখানকার সব বাঙালিদের চেনেন?’
‘প্রায় সবাইকেই চিনি। তবে আজকালকার ছেলে ছোকড়াদের একটু কম চিনি। একটু বয়স্ক যারা তাদের সবাইকেই চিনি। কেন বলো তো।’
‘তাহলে তো চট্টগ্রামের অধিবাসীদের সাথেও আপনার যোগাযোগ থাকার কথা।’
‘তা আছে। আমি তো চট্টগ্রামেরই মানুষ। তুমি কি কেউকে খুঁজছো?’
‘হ্যাঁ, আমি চট্টগ্রামের এক ভদ্রলোককে খুঁজছি, যিনি আমার দিদুন এর কাজিন। দিদুন আর তার কাজিন ছোটবেলা থেকে একসাথেই বড় হয়েছে,ওরা শুধু ভাইবোন ছিলো না, বন্ধুও ছিলো।’
‘আচ্ছা, তাই নাকি! ভেরি ইণ্টারেস্টিং!’
‘আমার দাদুনকে আমি দেখি নি। শুনেছি তার সাথেও সেই ভদ্রলোকের খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। দাদুন যখন মারা যান তখন দিদুন আশা করেছিলেন তিনি একবার দেশে যাবেন। যান নি, একবার খোঁজও নেন নি।’
‘তোমার দাদুন কী চট্টগ্রামের অধিবাসী?’
‘হ্যাঁ, শুনেছি আমার দাদুন অনেক বড় চাকরি করতেন । তিনি এক বিখ্যাত লেখকও ছিলেন।’
‘তাই নাকি?’
‘হুম। দিদুন, মাম্মা আর বাবা দাদুনকে নিয়ে খুব ঢ়ৎড়ঁফ ভববষ করে।’
‘আচ্ছা!’
‘জানেন আমার দিদুনও লিখালিখি করে। ওঁর অনেক বই আছে। দিদুন আমাকে বাংলা লিখতে পড়তে শিখিয়েছে।’
‘খুব ভালো কথা। তুমিতো বাংলা বলোও ভাল।’
‘দিদুন বলে দিয়েছে বাসায় বাংলায় কথা বলতে হবে। বাবা মাম্মাও তা মেনে চলে।’
‘বাহ, খুব ভালো কথা। তোমার দিদুন কে নিয়ে এলে না কেন, ভাইবোনের দেখা হয়ে যেতো।’
‘আমার যখন দু’মাস বয়স তখন দিদুন নিউইয়র্ক এসেছিলো। ওহ ভধপঃ আমরা সবাই এসেছিলাম। তখন দিদুন আমার সেই মামাদাদুর সাথে দেখা করতে চেয়েছিলো। তিনি নাকি দেখা করেননি। দিদুন খুব কষ্ট পেয়েছেন।’
‘ঝড় ংবফ’
‘কখনো সুযোগ হলে মামাদাদুর কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য দিদুন আমাকে একটা ছোট্ট খাম দিয়েছেন। যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আপনার কাছে রেখে যায়, নাম লেখা আছে। কোনদিন দেখা হলে একটু দিয়ে দেবেন।’
‘আমি খোঁজখবর নিচ্ছি তিনি কোথায় থাকেন, তুমি নিজেই দিয়ে দিও না হয়। আমি তোমাকে নিয়ে যাবো তার কাছে।’
‘আসলে আমাকে আজকেই মানে আজ রাতেই এখান থেকে সরাসরি বাংলাদেশ যেতে হবে । বাবা মাম্মা টরন্টো থেকে আজকেই ঋষু করবে।’
অধীশ ওর ওয়ালেট থেকে ছোট্ট চার কোনা একটা খাম বের করে মনোজ মিত্রের হাতে দিলো। তারপর প্রণাম করে দ্রুত চলে গেইটের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
মনোজ মিত্র খামটা হাতে নিয়ে বেশ অবাক। খামের উপরে সুন্দর হস্তারে লিখা ‘মনোজ মিত্র’।
পেছন থেকে ডাকলেন তিনি,’দাঁড়াও অধীশ’।
গেইট পর্যন্ত গিয়েই থমকে দাঁড়ালো সে।
‘তোমার দিদুন এর নাম কী? কোথায় থাকেন তিনি?’
‘আমার দিদুন এর নাম রিয়া সুহাসিনী। কাল রাতে তিনি মারা গেছেন। তাই আমি বাংলাদেশ যাচ্ছি। আমরা গেলেই তাঁর সব কাজ হবে। আসি আমি। আমাকে ফাইট ধরতে হবে। ভালো থাকবেন আপনি।’
সে দ্রুততার সাথে বের হয়ে গেলো। অধীশের চোখ জলে ভরে উঠেছে।
বারান্দায় দাঁড়িয়েই হতভম্ব মনোজ মিত্র কাঁপা হাতে খামটা খুলে ফেললো। হাতের মুঠোই কিছু মাটি আর একটা সাদাকালো ছবি, সে ছবিতে চারজন শিশু পাশাপাশি বসে আছে, আলোছায়াতে।
মনজ মিত্রও এই বিকেলে আলো আঁধারীতে খুঁজছে নিজেকে।

Advertisement বিনোদনসহ যেকোনো বিষয় নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও- rupalialo24x7@gmail.com
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রোদেলা জান্নাত (Rodela Jannat)। ছবি : ফেসবুক
ঢালিউড3 weeks ago

শাকিব খানের নতুন নায়িকা রোদেলা জান্নাত, কে এই রোদেলা : অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

রঙ্গন হৃদ্য (Rangan riddo)। ছবি : সংগৃহীত
অন্যান্য3 weeks ago

ভাইরাল রঙ্গন হৃদ্যকে নিয়ে এবার সমালোচনার ঝড়

পূজা চেরি। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড4 weeks ago

শাকিব খানেও আপত্তি নেই পূজা চেরির

আয়েশা আহমেদ
অন্যান্য2 weeks ago

আয়েশা আহমেদের আবারও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় সাফল্য

শাকিব খানকে পেয়ে যা বললেন নতুন নায়িকা রোদেলা জান্নাত
ঢালিউড3 weeks ago

শাকিব খানকে পেয়ে যা বললেন নতুন নায়িকা রোদেলা জান্নাত

শাকিব খান ও রোদেলা জান্নাত। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা3 weeks ago

বুবলীর পর এবার সংবাদ পাঠিকা রোদেলা জান্নাতকে নায়িকা বানাচ্ছেন শাকিব খান

পায়েল চক্রবর্তী
টলিউড3 weeks ago

টালিউড অভিনেত্রী পায়েল চক্রবর্তীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

ঢালিউড3 weeks ago

এক হচ্ছেন শাকিব খান-নুসরাত ফারিয়া

শিনা চৌহান
অন্যান্য3 weeks ago

শিনা এখন ঢাকায়

অঞ্জু ঘোষ। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড3 weeks ago

যে কারণে অবশেষে ঢাকায় ফিরলেন চিত্রনায়িকা অঞ্জু ঘোষ

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
নির্বাহী সম্পাদক : এ বাকের
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম