Connect with us

গল্প

একজন নামানুষ কিংবা একুয়ারিয়ামের গল্প || লিটন মহন্ত

Published

on

একজন নামানুষ কিংবা একুয়ারিয়ামের গল্প

একজন মানুষ রিকশা চালিয়ে যাচ্ছে আর রিকশার সিটের উপর একটি কুকুর চুপচাপ বসে আছে, ভদ্র যাত্রি, জ্যামে রিকশা থেমে গেলেই ঘেউ ঘেউ করে উঠল, আশপাশের লোকজন পাশ ফিরে তাকায়। তমাল দৃশ্যটা বেশ জমিয়ে দেখল; মানুষ পশুর দাস। সভ্যতার প্রথম থেকেই মানুষরা পশুর উপর কর্তৃত্ব করে আসছে এখন পশুদের পালা; ওরা এখন প্রতিশোধ নিবে। অবশ্য সত্য যে, পশুরা এখন প্রায় মানুষের ভেতর রাজত্ব করছে, মনুষ্যত্ব আজ নির্বাসনে। কাঁটাবনের ঢালে কিছুক্ষন হাটার পর একটা শৌখিন মাছের দোকানের সামনে দাড়িয়ে কিছু বিদেশী মাছের জলকেলি দেখল। তমালের বাসায় চারটা একুয়ারিয়াম আছে, সেখানে বিভিন্ন ধরনের মাছ পোষে সে, অরেন্ডা গোল্ডফিস, এঙ্গেল, সোর্ড টেইল, মলি, কালার গাপ্পি।

মধ্যরাতে তমাল গোল্ডফিসের সাথে কথা বলে, মাছ টা তার খুব প্রিয়, তমাল একুয়ারিয়ামের কাছে গেলেই সে লেজ নাড়িয়ে অনেক রঙ ঢঙ করে, পিটপিট করে তাকায়। বাসায় তমাল তার মায়ের সাথে থাকে, ছোট ভাই বুয়েটে পড়ে সে হোস্টেলে থাকে। মা রাহেলা বেগম প্যারালাইসিস এর রোগী সারাদিন হুইল চেয়ারে বসে থাকে, বাকিটা সময় বিছানায়, তাকে সার্বক্ষনিক দেখার জন্য একজন কাজের লোক আছে। তমাল পিএইচ.ডি শেষ করে একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেছে, সে প্রাণিবিজ্ঞানের ছাত্র ছিল। বিয়ের জন্য রাহেলা বেগম ছেলে কে পিড়েপিড়ি করে কিন্তু তমাল এখন তার মনের মত মেয়ে খুঁজে পাচ্ছে না। মাছেরা মানুষের ভাষা বোঝে কিন্তু মানুষ মাছেদের ভাষা বোঝে না কিন্তু তমাল ব্যাতিক্রম সে স্পষ্ট বুঝতে পারে গোল্ডফিস কখন তাকে কি কথা বলে। তমাল গোল্ডফিসটির নাম দিয়েছে মীরু, মীরুর সাথে তমালের প্রায় রাতে কথা হয়। সাধারণত গভির রাত ছাড়া মীরু তমালের সাথে কথা বলে না।

একদিন সচেতন ভাবেই তমাল খেয়াল করল মীরু গভির রাতে আর মাছ থাকে না, তখন সে মৎস্যকন্যা হয়ে যায় এবং মানুষের ভাষায় চিঁ চিঁ করে ক্ষীন কন্ঠে কথা বলে। নিজের কাছেই নিজেকে অদ্ভুত লাগে ব্যাপারটা। ঘটনাটা মানুষ কে বললে নির্ঘাত তাকে পাগল ভাববে কিন্তু এই পৃথিবীতে অনেক অসম্ভব কিছু সম্ভব এবং স্বাভাবিক, ব্যাপারটা কাকতালীয়ও বটে কিন্তু মিথ্যে নয়, যুক্তির পিছনে যুক্তি আছে। প্রতিদিন মীরুর সাথে কথা না বললে তমালের ভাল ঘুম হয় না, মীরু তাকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। একদিন পড়ন্ত বিকেলে রাহেলা বেগম স্ট্রোক করে মারা গেল, তারপর তমাল আরও একা হয়ে গেল, সমস্ত বাসায় বিষণ্নতা ঘুটঘুট করে খেলা করে। কাজের লোকটাও চলে গেছে, এলামেলো জীবন শুরু হলো, তমালের ছোট ভাই তপু মাঝে মাঝে ভাইয়ার খোঁজ নেয়ার জন্য বাসায় আসে, আবার চলে যায়। ফ্ল্যাটে একটা কাজের ছেলে নিয়ে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের পিয়ন কালুমিয়াকে বলে; কালুমিয়ার দূর সর্ম্পকের চাচাতো ভাই। ছেলেটির নাম মনুমিয়া, মনুমিয়া সারা দিন বাসা পরিস্কার করে, মাছেদের খাবার দেয়, তমালের জন্য রান্না করে, রাত নয়টার পরেই সে ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তাকে কোলে তুলে নিয়ে গেলেও সে টের পাবে না। একদিন চৈত্রের শুক্রবারে পরমা আরিেফনের সাথে তমালের বিয়ে হয়ে গেল, পরমা তমালের ছোট মামা জগলুল সাহেবের ছোট শ্যালকের মেয়ে।

পরমা সত্যি দেখতে পরমা সুন্দরী, হাসলে তার গালে টোল পড়ে, চুলে ঢেউ খেলান মসৃন জল প্রপাত হাঁটুর কাছে এসে পড়েছে, এমন মেয়ে দেখলে মরে যেতে ইচ্ছে করে, এ মরণেও সুখ। তমাল পরমার রুপে মুগ্ধ, কিন্তু জৈবিক টান টা একটু শিথিল, মনে হয় এই নারী কে শুধু নিষ্পাপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখা যায়, কোন পঙ্কিলতা এখানে চলে না। শারীরিক সম্পর্ক যদি সব সময় বৈধ হবে, তবে এই বৈধতা কে কেন্দ্র করে কেন অবৈধ সব সম্পর্ক সমাজ কে ক্রমশ নগ্ন করে চলছে। নগ্নতা কখন কখন সৌন্দর্য হতে পারে কিন্তু প্রকৃতি সেখানে ধ্বংসের বীজ যেমন পুঁতে দিয়েছে, তেমনি সৃষ্টির চক্র এখানে অমোঘ ভাবে স্বয়ংক্রিয়। এখানে পাপটা খুব ঘনিষ্টভাবে জীবন কে স্পর্শ করে চলে যায়, কখন ধূসর, বর্ণহীন আবার কখন বা পুরোটাই অন্ধকার, অন্ধকারে নগ্নতার কোন মূল্যনেই, মূলত নগ্নতাই অন্ধকার কে গ্রাস করেছে আজীবন। অনেক আলো চাই, আলো আছে বলেই মানুষের পোশাকের প্রয়োজন হয়েছে।

পরমার নগ্নতায় তমাল কোন অন্ধকার দেখে না, সেখানে আলোর রোশনাই আলো হয়ে ভাসে। পরমা ঘুমিয়ে গেলে তমাল মীরুর কাছে আসে, মীরু তমাল কে বশ করে। তমাল যখন বিছানায় ঘুমাতে যায় পরমা তখন অনন্য বিছানাপরি হয়ে খাটের উপর শুয়ে থাকে, পরমা কে স্পর্শ করে, পরমা তখন আরও ঘুমপরি হয়ে গভির থেকে গভিরে চলে যায়। বিয়ের একমাস হলেও পরমার শরীরে একদিনের জন্যে হলেও নখ বসাতে পারে না তমাল। একদিন সন্ধ্যামুখর বৃষ্টিতে তমাল বাসায় ফিরে আসে, শরীর ভিজে গেছে, পরমা চুল এলিয়ে বিছানায় শুয়ে কান্না করছে, ভরা নদীর উপর দিয়ে আগুনের নৌকা দাউ দাউ করে জ্বলছে, কারণ বুঝতে পারে তমাল। বুকের ভেতর পরমা কে জরিয়ে ধরে তমাল, পরমার চুলের গন্ধ নেয়, শরীরের গন্ধ নেয়, কিছুক্ষণ পর হঠাৎ একটা বিদঘুটে আশঁটে গন্ধ তমালের নাকে এমন ভাবে ঘাই মারে, সে দৌড়ে বেসিনে গিয়ে গলগল করে বমি করে দেয়। মাথাটা ঘুড়তে থাকে, জীবনে এই প্রথম তমাল এই রকম গন্ধের স্বাদ পেল, সবকিছু বিস্বাদ মনে হচ্ছে, রাতে কিছুই খেতে পেল না, গভির তন্দ্রায় চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে, তমাল ঘুমের ভেতর অন্য এক গন্ধের সন্ধান পায়।

কিছুদিন পর এমন হল, পরমা তমালের কাছে আসলেই গন্ধটা আবার ফিরে আসে কিন্তু তমাল স্ত্রী কে কিছুই বলল না। তমাল পরমা কে কিছুদিনের জন্য তার মায়ের কাছে রেখে আসল, ওর একটু পরিবেশ চেন্স করা প্রয়োজন। শ্বশুরবাড়িতে হঠাৎ মাঝরাতে তমালের ঘুম ভেঙে যায়, হঠাৎ তীব্র ইচ্ছে জাগে মীরুর কাছে ছুটে আসার জন্য কিন্তু এতরাতে এভাবে চলে আসা সম্ভব নয়। বিছানায় ছটফট করতে থাকে তমাল, মুহূর্তে শরীর জেগে উঠলো পরমা চুল খামচে গন্ধ নেয়, কি অপূর্ব চুলের গন্ধ, কানের নিচে লতিতে ফর্সা আভা বরফ কুচির মত শরীরে শিহরণ জাগায়, সচেতন ভাবে তমাল খেয়াল করল এখন পরমার শরীর থেকে সেই বিদঘুটে গন্ধটা আর লাগছে না। তমাল বিছানায় পরমা কে সম্পূর্ণ ভাবে আবিষ্কার করল, জীবনের অভিন্ন স্বাদ এবং অখন্ড আনন্দ তাকে ক্রমশ গ্রাস করছে। শারীরিক সুখের ভেতর প্রবল ইচ্ছে মানুষ কে অনন্য সুখের লহরে বিহŸল এবং নিমজ্জিত করে, নগ্নতার মগ্নসুরে হারিয়ে যায় বর্তমান, অতীত এবং ভবিষ্যত। সুরসুর করে আবার নাকের ভেতর গন্ধটা ক্রমশ জমা হতে থাকে তমাল তখন উত্তেজনার চরম শেখরে বসে আছে, আবার শুরু হল বমি, গলগল, খক্খক্ করে ভেতরে উল্টিয়ে আসে অন্ননালী, পাকস্থলী সাপের মত প্যাচ মারছে। পরমার ফর্সা বুক, চুল তরল বমিতে লেপ্টে যায়, বেঢপ গন্ধে পরমার দম বন্ধ হয়ে আসে। নিজের শাড়ির আচঁল দিয়ে তমালের বমি পরিস্কার করতে থাকে সে, ঘরের ভেতর তখন নিয়ন আলো আলেয়ার ধূসর সমুদ্রে খলখল করছে।

মাঝরাতে পরমা বাথরুমে চুলে শ্যাম্পু করে গোছল করে, শরীর থেকে খসে পড়ছে কামনার ঝরা বকুল ফুল, ফুলে আর গন্ধ নেই আছে তমসার পোড়া দীর্ঘশ্বাস। সে রাতে আর বিছানায় নক্ষত্র খসে পড়ল না, শুধুই মেঘের নিশুতি শ্বাস গোপনে গোপনে ফেনা তোলে। পরের দিন খুব সকালের কমিউটার ট্রেন ধরে তমাল ঢাকায় চলে আসে জামালপুর থেকে। পরমার সামনের মাস থেকে মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা, অতএব সে জামালপুরেই থেকে যায়, সেখান থেকেই আনন্দমোহন কলেজে যাবে পরীক্ষা দিতে। সন্ধ্যায় ঢাকায় বৃষ্টি শুরু হল, বৃষ্টির নিনাদ স্পর্শ কাকতালীয় ভাবে তমালের বুকের ভেতর চাপড় মারছে, এ কেমন ভাবে চলছে জীবন, উল্টানো জীবন নিয়ে কি বেচে থাকা যায়। মীরু কে জীবন থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে, মীরু সুখে একুয়ারিয়ামে সংসার করছে, জল সংসার। রাত বারটার পর তমাল মীরু কে একটা ছোট গোল একুয়ারিয়ামে তুলে রাস্তায় বের হয়, বাতাস খেলছে বাতাসে। তমাল যখন ধানমন্ডি লেকের কাছে আসল তখন রাত বারটা চল্লিশ মিনিট বাজে, রিকশা চালক অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে কিভাবে একজন মানুষ মাছের সাথে ঝগড়া করছে। তমাল একুয়ারিয়াম সহ মীরু কে লেকের পানিতে ফেলে দিল, একটা বিশাল পাঁকাল মাছ যেমন পানির ভেতর ঘাই মারে তেমনিভাবে লেকের পানিতে খলবল শব্দ হয় তখন। তমাল ব্রিজের উপর অনেকক্ষন দাড়িয়ে থাকে মীরুর জন্য বুকটা ছটফট করছে। অনেকরাতে বাসায় ফিরে বেলকনিতে দাড়িয়ে বৃষ্টিমুখর নিশুতি রাতে তমাল পরমার কথা ভাবে, মনে হচ্ছে তার নিজের শরীরে কেমন খসখসে ভাব, শরীর চুলকায়, গন্ধ বের হয়, মাছের গন্ধ। তমাল রাতে অনেকক্ষন শাওয়ারের নিচে সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোছল করে। বাসা থেকে সব মাছ সে কাটঁবনে নিয়ে গিয়ে পানির দামে বিক্রি করে দিল। সমস্ত বাড়ি খা খা করছে, রাতে তমাল একটা ছয় ফুট লম্বা একুয়ারিয়াম কিনে নিয়ে আসল, তারপর সেটা পানি দিয়ে পূর্ণ করে মাঝরাতে নগ্নহয়ে সেটার ভেতর শুয়ে পড়লো, সে খুব সুখ পাচ্ছে, পানির ভেতর মাথা চুবিয়ে রাখলে শ্বাস নিতে তেমন কষ্ট হয় না। তবে কি তমাল মানুষ থেকে ক্রমশ মাছ হয়ে যাচ্ছে; সে কি পৃথিবীর প্রথম মৎস্যকুমার। মৎস্যকুমার তমাল চৌধুরী পিএইচ.ডি।

পরের দিল সকালে টিভিতে লাইফ খবর দেখাচ্ছে, গতরাতে ধানমন্ডি লেক থেকে দুইজন যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, মৃত্যুর কারণ অজ্ঞাত। পরের দিন সকালে আবার অন্য দুইজন যুবকের লাশ উদ্ধার করল ধানমন্ডি থানার পুলিশ। এবার সমস্ত দেশের মানুষ নড়েচড়ে বসল, পুলিশ চৌকিদারী বাড়ান হলো লেকের পাড়ে কেউ যেন পানিতে নামতে না পারে, পরের দিন দুইজন পুলিশের মৃতদেহ পাওয়া গেল। ময়নাতদন্তে দেখা মৃত্যুর কারণ কিংবা খুনের কারণ অজ্ঞাত, দেশের সমস্ত মিডিয়া ধানমন্ডি লেক কে নিয়ে মেতে আছে, এ দিকে প্রতিরাতে তমাল ক্রমশ একটু একটু করে মৎস্যকুমার হয়ে উঠছে, একুয়ারিয়াম থেকে উঠে আসলে তার অস্বস্তি লাগে। মাছ হল সকল মেরুদন্ডী প্রাণীর আদি অবস্থা , বিবর্তনবাদের ধারায় এককোষী জীব থেকে তৈরী হয় বহুকোষী জীব এবং বহুকোষী জীব থেকে তৈরী হয় বিভিন্ন পর্বের প্রাণী। প্রথম মেরুদন্ডী প্রাণী হলো মাছ, মাছ থেকে আসে এম্ফিবিয়ান বা ব্যাঙ, সেখান থেকে সরীসৃপ, এরা ডাংগায় বিচরণ শুরু করলো, সরীসৃপ থেকে হলো পাখী..এভাবে আস্তে আস্তে স্তন্যপায়ী মেরুদন্ডী প্রাণীর উদ্ভব। হিন্দুশাস্ত্রে ইশ্বরের মৎস্য অবতারের কথা বলা হয়েছে। তবে কি মানুষ আবার পিছনে ফিরে যাচ্ছে, ইদানিং তমালের শরীরে মাছ মাছ গন্ধ , সে নিজেই সেই গন্ধ টের পায়। তমাল মাছ খাওয়া ছেড়ে দিল; ভাত খেতে ভাল লাগে না, পেটে ক্ষুধা থেকে যায়। একদিন গভির রাতে তমাল যখন একুয়ারিয়ামের ভেতর মাথা চুবিয়ে শুয়ে আছে এমন সময় স্বপ্নের ভেতর রাহেলা বেগম কে দেখল। সে ছেলের অবস্থা দেখে কাদছে, পরমা কে বাসায় ফিরিয়ে আনতে বলছে, পরমা বাসায় আসলে আবার সব আগের মত ঠিক স্বাভাবিক হয়ে যাবে। পরের দিন তমাল রওয়ানা হল জামালপুরে পরমা কে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার জন্য, শ্বশুরবাড়িতে বাড়িতে সবাই কেমন সন্দেহের চোখে তমালের দিকে তাকায়, তার চেহারা উ™£ান্ত লাগে।

পরমা ঢাকায় আসার পর তমাল স্থির করলো, নিজের বউ কে সমস্ত ঘটনা খুলে বলবে, সে এ জীবন থেকে মুক্তি চায়। পরমা মীরু আর অন্য মাছদের খুঁজতে থাকে, একটা প্রায় ছয়ফুট লম্বা একুয়ারিয়াম পিছনের ঘরে পানি সহ আছে, সে দেখে একটু অবাক হয় কিন্তু স্বামী কে কোন প্রশ্ন করে না। আজ রাতে জোছনা নামে, মন ভাল কিংবা খারাপ করার মত জোছনা। বেলকনিতে বাতাসের নিমগ্নতায় তমাল পরমার হাত ধরে বসে আছে; অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে পরমার খোলা চুল, পিঠের মসৃন ফর্সা খোলা অংশটুকু, তমাল টুপ করে পরমা কপালে ঠোট স্পর্শ করে, শরীরে শিহরণ লাগে, অনেক গল্প বলে পরমা কে তমাল কিন্তু কিছুতেই তার মীরুর জাদুবাস্তবতার কথা বলে না, এ গল্প কেউ বিশ্বাস করবে না।

তারা রিকশায় চড়ে টিএসসি চলে যায়, অনেক রাতে বাড়ি ফেরে ডিনার করে। দু‘জন মুখোমুখি বসে থাকে স্বচ্ছ চাঁদের আলোয়, তমাল পরমার দীর্ঘচুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। রাত তখন গভির তমাল অনুভব করছে তার এখন একুয়ারিয়ামের ভেতর শুয়ে থাকা দরকার কিন্তু পাচ্ছে না। একসময় তমাল পরমার কোলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, মাছের মত ছটফট করতে করতে সে বেহুশ হয়ে যায়। পরের দিন তমালের যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন সে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে, নাকের ভেতর অক্্িরজেনের নল লাগান, সিরসির করে নির্মল অক্্িরজেন তার ফুসফুসে প্রবেশ করছে, পাশে মলিন চেহারা নিয়ে বসে আছে পরমা। পরমার চোখে হাজার ক্লান্তি, তার পিছনের ছায়াটাও বিধ্বস্ত। ভাইয়ার অসুস্থতার কথা শুনে তপু এসেছে, সে ছেলে বেলা থেকেই জানে তার ভাইয়া অন্য আট দশটা মানুষের চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা, অন্য মাটির মানুষ, প্রথমত পাগল মনে হবে কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে সাংঘাতিক রকমের অনুভূতি প্রবণ মানুষ, ভাল মানুষ। দেশের প্রখ্যাত সাইক্রিয়াটিস্ট ডাঃ আসরাফ করিমের সিরিয়াল নেয়া হলো তমাল কে দেখানোর জন্য। চেম্বারে শুধু ডাক্তার আর রোগী মুখোমুখি বসে আছে..হালকা কথোপকথন চলছে; পরমা আর তপু ওয়েটিং রুমে বসে আছে।

  • ছোট বেলায় খুব বেশি রুপকথার বই পড়তেন।

  • হু

  • আপনি জানেন আজ পর্যন্ত কেউ মারমেইড বা মৎস্যকুমরী দেখেনি, সবই গল্প, বানান।

  • ১৮৪৭ সালে সর্বপ্রথম ক্রিস্টোফার কলম্বাস ক্যারাবিয়ান দ্বীপের উপকূলে মারমেইড দেখেন, তার লগবুকে লেখা আছে।

  • আমি জানি সেই গল্প; সমুদ্রে অনেক ইলিউশন তৈরী হয়, কারণ নাবিকরা দীর্ঘদিন মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ভাবনার উপজগৎ তৈরী হতে থাকে। লবনাক্ত পানির কারণে সমুদ্রের পরিবেশটা আলাদা, সেখানকার বাতাসে প্রচুর পরিমান সোডিয়াম ক্লোরাইড থাকে, মস্তিষ্ক তখন ঠিকমত কাজ করে না। হয়তো কলম্বাসের তাই হয়েছিল।

  • কিন্তু এত উপকথা মারমেইড কে নিয়ে, সব মিথ্যে।

  • আপনি বোধহয় ছেলেবেলায় হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের রুপকথার বইয়ের খুব ভক্ত ছিলেন, সেখানে মৎস্যকুমরী নিয়ে গল্প আছে। সেই কল্পনা ও বিশ্বাস এখন আপনার মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় আছে। আর তাছাড়া আমরা মাতৃগর্ভে পুরো সময়টা একটা বদ্ধ একুয়ারিয়ামের মধ্যে থাকি, ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় এমনিয়ন ফ্লুয়িডের মধ্যে, শুধুমাত্র প্লাসেন্টার মাধ্যমে আমরা আমাদের সকল প্রয়োজনীয় উপাদান মাতৃদেহ থেকে পাই।

  • প্লিজ আপনি আমাকে সাইন্স শেখাবেন না। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম এখন ভার্সিটিতে পড়াই নিজেও পিএইচ.ডি করেছি। এখন যেতে পারি? আমার খুব বমি পাচ্ছে, আপনার শরীর থেকে পঁচা মাংসের গন্ধ আসছে।

  • মিথ্যে বলছেন কেন? আমি কোন পারফিউম ব্যবহার করি না। আমার শরীরে কোন দুর্গন্ধ নেই; কারণ হাইপারহাইড্রোসিসের সমস্যা না থাকার কারণে আমার শরীর বেশি ঘামে না। এটা আপনার মনের ভ্রম। বাসায় গিয়ে আজ রাতেই একুয়ারিয়ামটিকে বাসা থেকে সরিয়ে ফেলবেন, তা না হলে একদিন আপনি ওখানে দম বন্ধ হয়ে মরে যাবেন, অবচেতন মনেই নিজেই নিজেকে হত্যা করবেন কিন্তু এটা আতœহত্যা নয়।

বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে তমাল ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হল, পরমা ভেতরে গেল, ডাক্তার ডেকেছেন। বাসায় ফিরে তমাল ঘুমিয়ে পড়ল গভির ঘুম, তার নাক নিয়ে বিকট শব্দ হচ্ছে..পট্ পট্ পট..। শেষরাতে তমালের ঘুমভাঙে, পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা, বিছানায় পরমা নেই। ঘরে শুধু জিরোবাল্ব জ্বলছে, তমাল বাথরুমে যায় এরপর পাশের ঘরে, বেলকনিতে কোথাও পরমা নেই। একটু ভয় লাগে তমালের, পরমার অনুপস্থিতি তার ভেতর প্রবল দুশ্চিন্তার রেখাপাত তৈরী করল। পিছনের ঘরে দরজার সামনে দাড়ালে তমাল দেখতে পেল পরমা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে একুয়ারিয়ামের ভেতর শুয়ে আছে, শুধু লম্বা চুলের ডগা অনেক খানি ভেসে আছে পানির উপর, ঘন চুলের কারণে পরমার মুখ দেখা যাচ্ছে না। তমাল হকচকিয়ে যায়..বাইরে তখন প্রবল জোছনা খেলছে..ক্রমশ রাত শেষ হচ্ছে…একটা জানালার কপাট খোলা..সে দিকে ফুলের গন্ধ আসে।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook

(ভিডিও)
অন্যান্য1 week ago

আলোচনায় ‘রস’ (ভিডিও)

মাসুমা রহমান নাবিলা (Masuma Rahman Nabila)। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা4 months ago

‘আয়নাবাজি’র নায়িকা মাসুমা রহমান নাবিলার বিয়ে ২৬ এপ্রিল

‘মিথ্যে’-র একটি দৃশ্যে সৌমন বোস ও পায়েল দেব (Souman Bose and Payel Deb in Mithye)
অন্যান্য4 months ago

বৃষ্টির রাতে বয়ফ্রেন্ড মানেই রোম্যান্টিক?

Bonny Sengupta and Ritwika Sen (ঋত্বিকা ও বনি। ছবি: ইউটিউব থেকে)
টলিউড4 months ago

বনি-ঋত্বিকার নতুন ছবির গান একদিনেই দু’লক্ষ

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)
অন্যান্য4 months ago

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)

ভিডিও5 months ago

সেলফির কুফল নিয়ে একটি দেখার মতো ভারতীয় শর্টফিল্ম (ভিডিও)

ঘটনা রটনা6 months ago

ইউটিউবে ঝড় তুলেছে যে ডেন্স (ভিডিও)

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌'কথার কথা' (প্রমো)
সঙ্গীত7 months ago

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌’কথার কথা’ (প্রমো)

সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া
সঙ্গীত7 months ago

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান গাইলেন সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া

মাহিমা চৌধুরী (Mahima Chaudhry)। ছবি : ইন্টারনেট
ফিচার8 months ago

এই বলিউড নায়িকা কেন হারিয়ে গেলেন?

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম