Connect with us

মতামত

প্রবাসে ঈদ উদযাপন || রায়হান আহমেদ

Published

on

প্রবাসে ঈদ উদযাপন || রায়হান আহমেদ

লন্ডনসহ ব্রিটেনজুড়ে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় ঈদ উদযাপন সম্পন্ন হয়েছে। এক মাস সিয়াম সাধনার পর পবিত্র ঈদুল ফিতর সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। সিয়াম সাধনার মাস রমজান ব্যক্তিজীবনকে সুন্দর, পরিশুদ্ধ ও সংযমী করে। মুমিন মুসলমানরা মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর অনাবিল আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর। আর ঈদুল ফিতরের উৎসবে সমাজের সব মতভেদ ও সীমানা অতিক্রম করে মানুষে মানুষে মহামিলন ঘটায় ও সৃষ্টি করে পরস্পরের প্রতি আন্তরিক মমতাবোধ ও শ্রদ্ধাবোধ। খুশির বার্তা নিয়ে উদিত হয় ঈদের ‘বাঁকা চাঁদ’। ঈদের চাঁদ উঠলেই হঠাৎ করে প্রবাসীদের চোখের পাতা ভিজে ওঠে। ঈদে প্রবাসীরা মা-বাবার পা ধরে ‘কদমবুচি’ করতে পারে না। মা-বাবার কবর জিয়ারতও করতে পারে না। সন্তানদের আদর করতে পারে না। সন্তানদের নানারকম বায়না ধরার হাসি-কান্না উপভোগ করতে পারে না। ঈদের মার্কেটিং নিয়ে গিন্নির মান-অভিমান দেখতে পারে না। ছোট শিশুদের ‘ঈদ সেলামি’ দিয়ে তাদের ‘তৃপ্তির হাসি’ দেখতে পারে না। এই দুঃখ বেশিরভাগ অভাগা প্রবাসীর। আরবের ঘরে ঘরে আনন্দ। রাস্তায় রাস্তায় খুশির জোয়ার। শপিংমল কেনাকাটা শেষে এখন অনেকটাই ফাঁকা। লাখো মানুষের পদচারণায় পিষ্ট এই শপিংমলকে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে চোখ জলে টলমল করে ওঠে আবুল মিয়ার। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া চোখের জল মিশে যায় তীব্র গরমে গা থেকে বেরিয়া আসা দুর্গন্ধময় ঘামের সঙ্গে।

প্রবাসীদের মনে কেবল একটাই যাতনা- এত কষ্টের পরও ছেলেমেয়েদের ঈদের কাপড় কিনেই টাকা শেষ। ঈদ চলে গেলেও মায়ের জন্য কিনতে পারেনি কিছুই। ঠিক এমন সময় দেশ থেকে ফোন আসে। ফোনে ওপার থেকে মা জিজ্ঞেস করেন, বাজান কী করো? চোখ মুছতে মুছতে আবেগ সামলে রফিক মিয়া বলেন, মা, সব বন্ধু-বান্ধব মিলা সেমাই খাই। এটাই হলো মধ্যপ্রাচ্যে বাঙালিদের ঈদ। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। যারা একটু পুরনো, বাড়িতে টাকার চাপ যাদের একটু কম, যাদের কপাল একটু ভালো তারা অনেকে ঈদে বেশ মজাও করেন। রান্না করেন সেমাই, পোলাও, উটের গোশত। গায়ে জড়ান নতুন জামা। আরবদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজও আদায় করে থাকেন। তবে মিসরে বাংলাদেশিদের অবস্থা কিছুটা ব্যতিক্রম। এখানে সাধারণত দুই শ্রেণির বাংলাদেশি আছেন। ছাত্র এবং গার্মেন্টসকর্মী। ছাত্রদের হাতে টাকা-পয়সা কম থাকলেও তারা মোটামুটিভাবে ভালোই ঈদ উদযাপন করে থাকেন। যারা হোস্টেলে থাকেন তারা বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। খাওয়া-দাওয়া সব শেয়ার করেন। নতুন জামাকাপড় পরেন। আর যারা বাসা ভাড়া করে থাকেন তারা অনেকে আগের রাতেই কিছু রান্না করে রাখেন। ভোরে নামাজ আদায় করে এসে কিছু খেয়ে ঘুম দেন। দুপুরে উঠে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করে আড্ডা দেন। সন্ধ্যায় ছাত্র সংগঠনের অনুষ্ঠানে যোগ দেন, তার পর রাতভর আড্ডা অথবা নীলনদের পারে ঘুরতে যান।

অপরদিকে গার্মেন্টসকর্মীরা ঈদে তিন-চার দিন ছুটি পান। তারা সাধারণত একসঙ্গে অনেকজন থাকেন। কাজেই তাদের ঈদ আনন্দটা একটু বেশিই। খাবার আয়োজনেও তারা বেশ মনোযোগী। পাঁচ-সাতজন মিলে রান্না করেন। দুপুরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যান। সন্ধ্যায় অনেক সময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। একসঙ্গে গান গান ও মজা করেন। রাতে শুরু হয় দেশে ফোন করার প্রতিযোগিতা। কারণ পরের দিন বাংলাদেশে ঈদ। সারাদিন যতই উৎফুল্ল থাকুক রাতে দেশে কথা বলতে গিয়ে সবাই আবেগী হয়ে ওঠেন। পাওয়া না পাওয়া হিসাব মেলাতে না পেরে সবাই প্রায় একই মুখস্থ উত্তর দেয়, অনেক কিছু খাইছি, অনেক মজা করছি, আমি ভালো আছি, আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।

প্রবাসে যান্ত্রিকজীবনের মাঝে ঈদের মহা আনন্দকে বরণ করে নিতে হয়। যার একমাত্র যৌক্তিক কারণ দেশ নয়, বিদেশ। ঈদ মানেই তো হাসি, আনন্দ ও উল্লাস। তবু আনন্দের মাঝে কোনো কোনো কাল নিরানন্দ থাকে। একটি বছর কত চড়াই-উতরাই পার করতে হয় মানবজীবনে। কিন্তু বছরের দুটি দিন এলে দুঃখ, বিরহ-বেদনা, কেশ সব দূর হয়ে যায়। ঈদের পূর্ববর্তী বার্তার আগমনে। ণিকের জন্য হলেও ঈদের খুশিতে সব রাগ-রাগিনীর অবসান ঘটে।

স্বদেশে ঈদের এক-দুই সপ্তাহ আগেই চারদিক আনন্দে জোয়ার বইতে শুরু করে। ঈদুল ফিতরে রমজানের বাহারি ইফতার আর ঈদুল আজহার সময় কোরবানি করার ধুম। এই ভিন্ন ভিন্ন আনন্দ মনকে উতলা করে তোলে। বেদনাসিক্ত মন থাকলেও এই মহাখুশির দিনে সব ধেয়ে যায় অজানা ঠিকানায়।

প্রবাসে একজন অন্যজনের দাওয়াতি মেহমান হিসেবে বাসায় আসে। ঘরোয়া পরিবেশে কতই না মজা হয়, যা এক সময় স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি হয়ে রয়। এই আনন্দময় সময় গল্পগুজব প্রবাসে আধুনিকায়নের যুগে সব থাকা সত্তে¡ও পাওয়া যায় না। তাই চিরস্মরণীয় এই দিনে বিলাত থেকে মনে পড়ে সবাইকে। প্রবাসে সবই আছে। নেই লাল-সবুজের সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলের বাংলাদেশ। ঈদ আছে। নেই ঈদের আনন্দ। প্রতিবেশীও আছে। নেই মনের মতন প্রতিবেশী। এই খণ্ড খণ্ড হৃদয়ের চাওয়াগুলো প্রবাসের এত চাকচিক্যের মাঝে মন ভরে না। ফিরে যেতে মন চায় মাটির টানে স্বদেশের আঙিনায়। মানুষ যেখানে যায় সেখানে দুটো শক্তি যায় তার সঙ্গে। এক : বিশ্বাস। দুই : সংস্কৃতি। বিদেশে এই সময়ে যে লাখ লাখ বাঙালি তাদের স্থায়ী নিবাস করে নিয়েছেন- তারাও মূলত এই শক্তিতে বলীয়ান। ধর্ম বিশ্বাসের একটি স্তর। অভিবাসীদের আনন্দের একটি অন্যতম দিন হলো ঈদ। ঈদ এলেই অভিবাসী বাঙালির মনের ক্যানভাসে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা হলো স্বদেশের মুখ। কেমন আছেন স্বজন? কেমন আছে জন্মমাটি? প্রবাসে ঈদের আনন্দ মানেই হচ্ছে এক ধরনের তীব্র শূন্যতা। কথাটি সব প্রবাসীই স্বীকার করবেন একবাক্যে। তার কারণ হচ্ছে, ঈদের দিনটি এলেই এক ধরনের নস্টালজিয়া মনটাকে ভারী করে তোলে। ফেলে আসা সেই শহর কিংবা গ্রাম, সেই আড্ডা, সেই মধুর স্মৃতি, মা-মাতৃভ‚মির টান বুকের পাঁজরে দোল খেয়ে যায়। আহা! সোনার আলোয় ভরা সেই দিনগুলো…। প্রবাসে ঈদের অভিজ্ঞতা আমার তিন দশকের বেশি সময়ের। বিদেশের বিভিন্ন দেশে ঈদ করতে গিয়ে যে সত্যটি খুব একান্তভাবে প্রত্য করেছি তা হচ্ছে, প্রবাসে একজন বাঙালিই অপর বাঙালির ঘনিষ্ঠ স্বজন। তা পরিচিত হোক অথবা অপরিচিত। মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোয় ঈদের আনন্দই আলাদা। পবিত্র রমজান মাস এলেই রোজার আমেজে সিক্ত হয়ে ওঠে পুরো নগরী। ধর্মপ্রাণ মানুষের উপাসনা, ইফতারির বাহারি আয়োজন সৃষ্টি করে একটি ভাবগম্ভীর পরিবেশের।

নিউইয়র্কের স্কুল-কলেজগুলোয় এখন হাজার হাজার বাঙালি অভিবাসী শিার্থী লেখাপড়া করছে। দুই ঈদে সরকারি ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে নিউইয়র্কে। ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। এ কথা সত্য হলেও সবার জন্য সমান সত্য নয়। কারণ দেশে আত্মীয়-পরিজন নিয়ে মহা আনন্দে ঈদ উদযাপন করলেও প্রবাসীদের জীবনে এর বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় না। আর তাই ঈদে তাদের আনন্দটা অতটা গাঢ় রঙ ধারণ করে না। প্রবাসে অনেকেই আছেন যাদের জন্য ঈদের দিনটা অত্যন্ত কষ্টের। এই কষ্টকে বুকে নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি প্রবাসীরা ঈদ উদযাপন করে থাকেন। প্রবাসীদের ঈদ উদযাপনের খোঁজখবর নিতে গিয়ে তেমনটাই আঁচ করা গেল। প্রবাসীরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়েছেন, বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের মতো এখানেও ঈদকে নিয়ে আশা-আকাক্সক্ষা আর প্রস্তুতির কমতি থাকে না। কিন্তু প্রিয়জনদের হাজার মাইল দূরে রেখে ঈদ আনন্দ পাথরচাপা কষ্টে পরিণত হয়। আত্মীয়-স্বজন রেখে দূরদেশে ঈদ করাটা সত্যিই বেদনার।

রায়হান আহমেদ
কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য

Facebook

(ভিডিও)
অন্যান্য1 month ago

আলোচনায় ‘রস’ (ভিডিও)

মাসুমা রহমান নাবিলা (Masuma Rahman Nabila)। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা5 months ago

‘আয়নাবাজি’র নায়িকা মাসুমা রহমান নাবিলার বিয়ে ২৬ এপ্রিল

‘মিথ্যে’-র একটি দৃশ্যে সৌমন বোস ও পায়েল দেব (Souman Bose and Payel Deb in Mithye)
অন্যান্য5 months ago

বৃষ্টির রাতে বয়ফ্রেন্ড মানেই রোম্যান্টিক?

Bonny Sengupta and Ritwika Sen (ঋত্বিকা ও বনি। ছবি: ইউটিউব থেকে)
টলিউড5 months ago

বনি-ঋত্বিকার নতুন ছবির গান একদিনেই দু’লক্ষ

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)
অন্যান্য5 months ago

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)

ভিডিও6 months ago

সেলফির কুফল নিয়ে একটি দেখার মতো ভারতীয় শর্টফিল্ম (ভিডিও)

ঘটনা রটনা7 months ago

ইউটিউবে ঝড় তুলেছে যে ডেন্স (ভিডিও)

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌'কথার কথা' (প্রমো)
সঙ্গীত8 months ago

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌’কথার কথা’ (প্রমো)

সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া
সঙ্গীত8 months ago

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান গাইলেন সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া

মাহিমা চৌধুরী (Mahima Chaudhry)। ছবি : ইন্টারনেট
ফিচার9 months ago

এই বলিউড নায়িকা কেন হারিয়ে গেলেন?

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
নির্বাহী সম্পাদক : এ বাকের
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম