Connect with us

গল্প

সে রাতে | পূর্ণপ্রভা ঘোষ

Published

on

সে রাতে | পূর্ণপ্রভা ঘোষ

কপালে একটা ছোট্ট টিপ, ঠোঁটে সামান্য লিপস্টিক ছোঁয়ালেই অনন্যা হয়ে ওঠে শর্মিষ্ঠা। নিজেকে সামলে রাখা তখন রীতিমত দুঃসাধ্য। মালকিনের অনুমতি না নিয়ে ছোট্ট করে ঠোঁট ছোঁয়ালাম কপালে। আপাতত এতেই সন্তুষ্ট, দেখা যাবে বাড়ি ফিরে।

ঠোঁটের কোনে দাঁত চেপে মালকিন ধমক লাগায়, ‘ফের অসভ্যতা’?

যত বকুনি খাই, ততই আকর্ষিত হই। শর্মিষ্ঠা সে কথা জানে ভালোই ! মানে না!

আমি ইঞ্জিনীয়ার মানুষ, এত দিনের লোহালক্কড়-ইঁটসিমেন্ট-কংক্রীট জীবনে কোথা দিয়ে এক পাগল প্রজাপতি উড়ে এসেছে, আমি পুরোই পাগল!

এদিক ওদিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে কত মেয়ে দেখেছি! তারা কেউ কেউ আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকায়ও রয়েছেন। কিন্তু শর্মিষ্ঠা একান্তই অন্যরকম। ওর মধ্যে আলাদা কি আছে বলতে পারবো না। কিছু তো আছেই। ওর চোখ দুটো? ঠোঁট? কপাল? গাল? চিবুক? চুল? চেহারা? হাত কিংবা আঙ্গুলগুলো? জানি না! সত্যিই জানি না! শুধু জানি, ওর জন্য সর্বান্তকরণে, সর্ব্বাঙ্গে পাগল আমি।

পিসিমনির নিমন্ত্রণে দুজনে এসেছিলাম, এখন বাড়ী ফিরছি। মাত্র মাস কয়েক আগে বিয়ে হয়েছে আমাদের। সেইসময় খুব শরীর খারাপ থাকায় বিয়েতে আসতে পারেননি পিসিমনি, তাই বৌ দেখাতে আসা। পিসিমনির দয়ায় মানুষ আমি। পিসিমনি বৌ দেখে খুব খুশী। তাই আনন্দটাও অনেকগুণে বেড়ে গেল।

তবে কিনা ছুটির দিনটা এভাবে ফুরিয়ে গেল! আবার চলবে প্রচন্ড ব্যস্ততা। হুটপাট দৌড় সারা সপ্তাহ জুড়ে। শর্মিষ্ঠাকে পুরোপুরি পাওয়ার আশ মেটে না। বাড়ী পৌঁছোনোর জন্য ছটপটিয়ে ব্যস্ত হই।

পিসেমশাই ভারী মজাদার মানুষ। কতযে মজার মজার গল্পের ভান্ডার রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। সেইসব ছেড়ে উঠে আসাও যায় না। আজকাল মানুষে হাসতে ভুলে যাচ্ছে। সারাক্ষণ দৈত্যপ্রায় অসম্ভব কাজের চাপে অকালে বুড়িয়ে যাচ্ছি সবাই। রামগরুড়ের ছানা হয়ে ভালো থাকা যায়? ওদিকে পিসিমনিও রাতের খাওয়ার না খাইয়ে ছাড়বেন না। দু’বেলাই, খেতে বসে পিসেমশাইয়ের গল্প-আড্ডা জমে ওঠে।

 


তাড়াহুড়ো করেও বেরোতে বেরোতে রাত্রি নটা!

শীতের রাত, স্টেশনে পৌঁছোলাম। সঙ্গে নতুন বৌ আর রাতের লোকালট্রেন। ভয়ে বুক ধুকপুক। চারদিক শুনশান। এদিক ওদিক কয়েকটা লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে। চিরকাল এপথে চোখ বন্ধ রেখেও চলতে পারি এতটাই অভ্যস্থ আমি। একটা নিশ্চিন্তি, ট্রেনটির সময়ে পৌঁছোনোর সুনাম রয়েছে। আমাদের বাড়ী পৌঁছোতে দশটা বড়জোর সাড়ে দশটা বাজবে। রিকশা পেলে ভালই, নইলে রাস্তাটুকু হাঁটব।

সুন্দরী নতুন বৌকে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরে নির্জন মধ্যরাতে চলার

মজা আলাদা, ভাবতেই রোমাঞ্চ জাগে। জানালার পাশে মুখোমুখি বসেছি দুজনে। হাল্কা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। শীতের রাতেও শর্মিষ্ঠা কিছুতেই জানালা বন্ধ করতে দেবে না।

সুন্দর লাল সিল্ক পরেছে শর্মিষ্ঠা, সঙ্গে লেমন ইয়োলো শাল। রুচীর তারিফ করতেই হয়। ঝুরো চুল চোখে মুখে উড়ে পড়ছে। মুগ্ধ, মুগ্ধ, বিহ্বল আমি!

নারীটি আমার। সম্পূর্ণরূপেই আমার! এইক্ষেত্রে আমি সৌভাগ্যবান।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে বছর কয়েক আগে আমাদের পরিচয়।

একঝলক আকাশে তাকালাম মুগ্ধ প্রেমিক। আধখানা ভাঙা চাঁদও চলেছে আমাদের সঙ্গে। হঠাৎ দুষ্টুবুদ্ধি এল মাথায়। এমন সুন্দর জিওগ্রাফির হিস্ট্রি নেই? যেমন চাঁদের কলঙ্ক! আমাকে নিঃস্তব্ধ করে শর্মিষ্ঠা ওর কাহিনী বলে নির্দ্বিধায়।

বিস্ময়াবিষ্ট আমি মুহূর্তে বাকরুদ্ধ। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত! আমাদের স্টেশন পেরিয়ে পরের স্টেশনে পৌঁছেছে ট্রেন, চমক ভাঙে! ধড়পড় করে ছুটে নেমে পড়ি। এতক্ষণ যাকে মাথায় নিয়ে চলেছিলাম এখন তার দিকে ফিরেও তাকালাম না! শর্মিষ্ঠা নিঃশব্দে পেছন পেছন নেমে এল। চোখের কোন দিয়ে দেখলাম। এখনই হয়ত একটা মারাত্মক দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত। ট্রেন গতি নিয়ে নিয়েছে। একজন প্যাসেঞ্জার খুব ধমক দিলেন আমায়! কান দিলাম না! রিক্সোতে দুজনে পাশাপাশি, অথচ শতযোজন দূরত্ব মাঝে! অলঙ্ঘনীয় বরফঠান্ডা প্রাচীর! কোন মুগ্ধতায় জানতে চাইনি আগে?

শর্মিষ্ঠা টিন-এজের রেপড ভিকটিম্! কথাটি শুনেই বড্ড অস্থির লাগছে! রাস্তায় অনেক দূরে দূরে এক একটা লাইটপোষ্ট। এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা, মাঝে মাঝেই অন্ধকার এসে ধমক দিচ্ছে। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে, কপালের শিরা দপ্-দপ্ করছে, বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমছে। ওদিকে হাতপা ঠান্ডা বরফ, মনটাও!

 


কয়েক বছরের পরিচয় পর্বকালে শর্মিষ্ঠা বারেবারে তার জীবনের কোনো এক গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ বলতে চেয়েছে। আমিই বরং উদারতার ভাণ দেখিয়ে বারেবারেই ওর মুখ বন্ধ করে দিয়েছি। এই আমার উদার হৃদয়ের লক্ষণ?

বাড়ি ঢুকতেই মায়ের শত জিজ্ঞাসা। পিসিমনি কি বললেন বৌ দেখে? কি খাওয়ালেন, কতটা খুশী? কোনো কথারই উত্তর দিলাম না, আসলে পারলাম না!

শর্মিষ্ঠা যথাসম্ভব স্বাভাবিক। মায়ের সঙ্গে কথায়-গল্পে ব্যস্ত হয়ে পড়ল এত রাতেও, হয়ত ইচ্ছে করেই। আমাদের বেডরুমটা শর্মিষ্ঠার নিজের হাতে সাজানো। ওর রুচির প্রশংসায় সারাক্ষণ পঞ্চমুখ হয়েছি আগে, কিন্তু বিতৃষ্ণা জাগছে কেন এখন? ওকে এড়িয়ে ভীরু-কাপুরুষের মত পালাতে চাইছিলাম আমি? মন শক্ত করে ভাবি।

সে রাতে কিছুতেই ঘুম এল না চোখে। পরদিন কাজে দৌড়োতে হবে, না ঘুমোলে চলবে না তাই অনেক চেষ্টা করলাম। কোনো প্রচেষ্টাই কাজে এল না!

পরপর কত কথাই মনে পড়ছে, ভাবছি। আমার এক বন্ধুর দিদি ছিল। বছর দশেক আগের কথা। একদিন, এমনই এক রাতের ট্রেনে কলেজ থেকে ফেরার সময় প্রচন্ড ভয়ঙ্কর কান্ড ঘটে। সেইসময় সামাজিক, রাজনৈতিক, সমস্ত প্রেক্ষাপটে হাজার হাজার ভুল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। বড্ড পড়াশোনা ভালোবাসত সেই দিদি। পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখত খুব। সেই শান্তশিষ্ট অথচ লড়াকু মেয়েটার অসময়ে মৃত্যুর পরেও সবাই মিলে কত না ক্ষতবিক্ষত করেছে।

কেউ বলেছে, ‘অতিরিক্ত সাহস! পড়াশোনা শিখে ব্যরিষ্টার হবে! দেশের পরিস্থিতি জানো না? কোন সাহসে রাতের ট্রেনে যাতায়াত কর?’ কেউ আবার বলেছে, ‘কে জানে কোথাও কিছু লটঘট করেছিল কিনা!’

রাজনৈতিক নেতারা আর এককাঠি উপর দিয়ে গিয়েছিলেন। একদল বলেছিল, মেয়েটি তাদের সমর্থক, তাই অন্যদল বদলা নিয়েছে। অন্যদল বলেছিল, দেশের আইন কানুনের এইত অবস্থা! মানুষের বিশেষ করে মেয়েদের নিরাপত্তা নেই! আর যাইহোক, কেউই চায়নি প্রকৃত অপরাধী যারা, তারা ধরা পড়ুক! সবাই চেয়েছে এই দূর্ঘটনাকে কে কতটা নিজেদের কাজে লাগাতে পারে।

মেয়েদের জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা আরোপ করা হয়েছে তারপর। তাদের পড়াশোনা, তাদের ঘোরাফেরাতে হাজারও বিধিনিষেধ।

সেইসময় ক্লাস টুয়েল্ভ আমার। কতভাবে প্রতিকারের স্বপ্ন দেখতাম।
নিশ্চিত এই অসুস্থ পরিস্থিতিকে পাল্টে দিতে পারব, স্বপ্ন দেখতাম, খুব স্বপ্ন দেখতাম।


আজকাল পরিস্থিতি একেবারে পাল্টে গেছে। না! আমি করিনি। সময় এনে দিয়েছে এই পরিবর্তন। মেয়েরা এখন অনেকখানি স্বাধীন, সতর্ক। আমরা খুশী।

কোনো মেয়ের জীবনে এমন দূর্ঘটনা পুরুষেরাই ঘটায় সেকথা ভুলে যাই আমরা। এবং আমাদের সমাজে তাইতো একপ্রকারে মেয়েরাই অপরাধীর সাজা পায়।

এইযে আমি, এখনও? শর্মিষ্ঠার নিখাদ ভালোবাসা উপেক্ষা করে এমন অন্যায় আচরণ করে ফেললাম? সঠিক ভাবনায় ফিরি একসময় কিন্তু সে ফেরে না!

আমার বাবা নেই, অনেক ছোটোবেলায় তাঁকে হারিয়েছি আমি। সে সময় পিসিমনি-পিসেমশাই আমাদের মা-ছেলের সম্পূর্ণরূপে দেখভাল করেছেন। তারপর বড় হয়ে আমি চাকরি পেয়ে মাকে সামান্য স্বস্তিসুখ দিয়েছি। এখন আমাদের সুখের সংসার। কষ্টের সময়ে আমি ছিলাম মায়ের একান্ত ভরসা, আর মাও আমার কাছে ভগবান, দেবী। শর্মিষ্ঠা এসে আমাদের জীবনের মহান জায়গাটা নিয়েছে, যেটুকুর অভাব ছিল।

জানি না মায়ের সঙ্গে কি যুক্তি-পরামর্শ করেছে সেই রাতে। তারপর থেকেই মায়ের ঘরে বিছানা সরিয়ে নিয়েছে শর্মিষ্ঠা। সম্পূর্ণই শুধরে নিয়েছি নিজেকে। তবুও ক্ষমা পেলাম না! মাকে কি বুঝিয়েছে ওই জানে, মাও কী বুঝেছেন জানি না!

আমি শুধু অবুঝ মনে প্রতীক্ষায় থাকি। নিষ্ঠুর এই পৃথিবীতে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত চাইলে এত বেশী ধৈর্য দরকার হয়, জানতাম না!

Advertisement বিনোদনসহ যেকোনো বিষয় নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও- rupalialo24x7@gmail.com
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অ্যাডমিরাল রিয়ার অ্যাডমিরাল মুশাররফ হুসাইন খান
অন্যান্য5 days ago

নৌবাহিনীর স্থপতি রিয়ার অ্যাডমিরাল মুশাররফ হুসাইন খান আর নেই

‘বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী পরিচিতি ও ব্যবস্থাপনা কৌশল’
সাহিত্য1 week ago

‘বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী পরিচিতি ও ব্যবস্থাপনা কৌশল’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

মেলারটেক স্বপ্ন কারিগর পাঠাগার
রূপালী আলো1 week ago

মেলারটেক স্বপ্ন কারিগর পাঠাগার

প্রি-অর্ডারে ‌‘আউটসোর্সিং ও ভালবাসার গল্প’
গ্রন্থালোচনা1 week ago

প্রি-অর্ডারে ‌‘আউটসোর্সিং ও ভালবাসার গল্প’

জগলুল হায়দারের জন্মদিনে প্রিয় ৫০ ছড়ার পাঠ উন্মোচন
জন্মদিন2 weeks ago

জগলুল হায়দারের জন্মদিনে প্রিয় ৫০ ছড়ার পাঠ উন্মোচন

মাসুদ আখতার পলাশ
অন্যান্য2 weeks ago

গাইবান্ধা-২ আসনে এগিয়ে ব্যারিস্টার মাসুদ আখতার পলাশ

রায়হান আহমেদ
মতামত2 weeks ago

সভ্যতার যুগে শিশুশ্রম : কীর্তি আর স্বপ্ন | রায়হান আহমেদ

স্বরূপ মণ্ডল
কবিতা2 weeks ago

স্বরূপ মণ্ডল -এর গুচ্ছ কবিতা

রকমারি3 weeks ago

ইয়ং ইকোনমিস্টস ফোরাম(ইয়েফ)

গ্লিটজ3 weeks ago

অবশেষে ফারিয়া-সাজ্জাদের ফুটেজ উদ্ধার!

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
নির্বাহী সম্পাদক : এ বাকের
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম