Connect with us

গল্প

হিমু ও রূপার গল্প | মাসউদ আহমাদ

Published

on

হিমু ও রূপার গল্প | মাসউদ আহমাদ

ছুটির দিনের এক বিকেলে ঢাকার নিউমার্কেটের বলাকা সিনেমা হলের সামনে রিকশা থেকে নামে রূপা। জুলাই মাসের তীব্র গরমের ভেতরেও অন্তর্গত চোখে সে টের পায়, কেউ একজন তার ওপর নজর রাখছে। কিছুক্ষণ দাঁড়ায় ভাড়া মিটিয়ে, মুঠোফোনে সময় দেখে; এরপর তেরছা-চোখে ডানে-বাঁয়ে তাকায় সে। কিন্তু সন্দেহ করার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

মানুষের মাথার পেছন দিকে, বিশেষ করে মেয়েদের, একটা লুকানো চোখ থাকে। সেই চোখ দৃষ্টিময় হয় খুব বিরল কিছু মুহূর্তে, যখন শরীরের ইন্দ্রিয়গুলো সূক্ষ্ম হতে হতে প্রায় দুর্বল বা দেহবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, কেবল তখনই সাড়া দেয় সেই অদৃশ্য চোখ। কিন্তু লোকটা কে হতে পারে? পুলিশ? গোয়েন্দা? নাকি পকেটমার? তবে লোকটা খুব চালাক। মানুষ ও দালানের আড়ালে টুক করে সরে পড়েছে, রূপার দেখে ফেলার আগেই।

সিনেমা হলের সামনে দিয়ে প্রায় স্রোতের মতো মানুষ যাওয়া-আসা করছে। ঢাকা শহরে এখন ছুটির দিন আর অফিস ডে বলে কোনো ব্যাপার নেই। গ্রামের মতো প্রতিদিনই হাট বসে এখানে। রিকশার টুংটাং, জ্যাম ঠেলে বাস, মিনিবাস এগোচ্ছে, ফুটপাতে মনিহারির দোকান, পেয়ারা বা ঝালমুড়ির ভাসমান দোকানে মানুষের ভিড়, কোলাহল—এসবের মধ্য দিয়েই রূপা বুঝতে পারে, একজন মানুষ তীক্ষ্ণ নজর রাখছে তার ওপর। সে ভয় পেয়ে যায় বা বিচলিত হয়, এমন নয়; কিন্তু অনুভব করে পিঠ বেয়ে নামছে একটা শিরশিরে অস্বস্তি। অনুমাননির্ভর বাস্তবতা ঠেলে নীলক্ষেতের দিকে এগিয়ে যায় রূপা।
সিনেমা হল পেরিয়ে ওভারব্রিজ। এরপর বাঁয়ে যে গলি, সেদিকে ঢুকে পড়ে সে। এদিকে খুব একটা আসা হয় না তার। কিংবা বান্ধবীর সঙ্গে দু–একবার এসেও থাকতে পারে, সেটা বেশ আগে।

মাঝে ফুটপাতের চেয়েও চওড়া রাস্তা, দুপাশে বইয়ের দোকান। ভিড় কম দেখে সে একটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং কাঙ্ক্ষিত ঠিকানাটি জিজ্ঞেস করে। লোকটি হাত উঁচিয়ে ইঙ্গিত করে একটা সরু গলির দিকে।
সেই সরু গলিতে ঢুকে পড়ে দিশেহারা বোধ করে রূপা। সব দোকানের নামও তো লেখা নেই। সে কাউকে জিজ্ঞেস করবে কী—‘আপা, কী বই লাগবে? এদিকে আসেন, এই যে আপা’—বলে দোকানিরা মাথা গরম করে দিচ্ছে।
‘এই যে শুনুন, মোস্তফা ভাইয়ের দোকানটা কোনদিকে?’ রূপা একজনকে জিজ্ঞেস করে।
একসময় খুব সন্তর্পণে সে মোস্তফা ভাইয়ের পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়।

লোকটাকে দেখে রূপা প্রথমে খুব ভ্যাবাচেকা খায়—লুঙ্গি পরা, দীর্ঘদেহী, কয়েক দিনের বাসি দাড়ি মুখে। তার কাছেই এসেছে, কিংবা কাজের কথা গোপন করে সে দোকানে এলোমেলো করে রাখা নানা রকমের বই দেখতে থাকে। নিজেকে তৈরি করে নেয়।
‘আঙ্কেল, আপনার নাম কি মোস্তফা?’
‘জি। আমি মোস্তফা।’
‘আপনার একটা ছেলে আছে না, সুজন?’
‘হুম। সুজন আমার ছেলে। ক্যান, হেয় কী করছে?’
‘না, কিছু না। ওর সঙ্গে একটু দরকার ছিল।’
‘কিছুক্ষণ খাড়ান। সে আইসা পড়ব।’
কেউ একজন বইয়ের দাম জিজ্ঞেস করে। মোস্তফা সেদিকে মনোযোগ দেয়।
‘এক্সকিউজ মি, আপনি কি রূপা?’
রূপা প্রায় চমকে উঠে পাশ ফিরে তাকায়। ভদ্র ও শান্ত গোছের এক যুবক। সে একদমই চিনতে পারে না।
‘আপনি?’
‘আমি আসাদ। আপনি যখন রিকশা থেকে নামলেন, আপনাকে দেখেই আমি চিনেছি।’
এবার চোখ সরু করে তাকায় রূপা, ‘আশ্চর্য তো, আমাকে চিনলেন কী করে?’
‘আপনি তো হিমু ভায়ের বান্ধবী। সে আমাদের বাসার পাশের মেসে থাকে।’

ও মাই গড! আমি হিমুর সন্ধানেই যে এখানে এসেছি, এটা এই লোক জানল কীভাবে? প্রায় তিন বছর হয়ে গেল, হিমুর কোনো খোঁজ নেই। অনেক কষ্টে এই ঠিকানা জোগাড় করেছি। বান্ধবী লীনা বলেছিল, সুজন নামে হিমুর এক বন্ধু আছে এখানে। লীনা একদিন এ এলাকায় দেখেছে তাকে। লীনা বলেছিল, সুজন বোধ হয় হিমুর সন্ধান দিতে পারবে। কিন্তু এ লোকটি কে?

আসাদকে দেখে সালাম দেয় মোস্তফা ভাই। ব্যস্ততার মধ্যেও বেশ গুরুত্ব দিয়ে কথা বলে। এসব লক্ষ করে রূপা। ভদ্রলোক যে তার বহু চেনা বা পাঁড় ক্রেতা, বুঝতে অসুবিধা হয় না মোটেও, বরং তাতে কিছুটা স্বস্তিই বোধ করে সে।
কিছুটা সহজ হয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকায় রূপা, ‘আচ্ছা, আপনি আমাকে চিনলেন কীভাবে?’
আসাদ লজ্জিতভাবে হাসে, ‘সত্যি বলতে, আপনাকে যতটা চিনি, জানি তার চেয়ে ঢের বেশি।’

ভ্রু কুঁচকে তাকায় রূপা, ‘কী রকম?’

‘এই ধরুন, হিমু ভায়ের কাছে এমন গল্প তো অনেক শুনেছি যে আপনি বাসায় কোনো কাজে ব্যস্ত, কিংবা ফ্রি বসে আছেন। হঠাৎ হিমু ভাই ফোন করে জানাল, কিছুক্ষণ পর তিনি আপনার বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যাবেন। আপনাকে ছাদে যেতে অনুরোধ করল। আর আপনি খুব সুন্দর করে সেজে ছাদে গিয়ে রাস্তার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকলেন। বেলা গড়ায়। কিন্তু হিমু ভাইয়ের দেখা নেই। একসময় মন খারাপ করে ছাদ থেকে নেমে আসলেন আপনি।’

রূপা এবার সব রকম দ্বিধা কাটিয়ে বলে, ‘চলুন, কোথাও বসে কথা বলি।’

ফুটপাতে এত মানুষ আর ঠেলাঠেলি। তারা ওভারব্রিজ পেরিয়ে নিউমার্কেটে চলে আসে। বসে একটা ফাস্টফুডের দোতলায়। দোকানের ভেতরটা নিরিবিলি। শীতল।
‘আমি নরমাল ফুচকা খাব। আপনি?’—রূপা বলে।
‘আমিও ফুচকা। তবে আমারটা দই ফুচকা।’

ফুচকা দিতে কিছুটা সময় নেয় দোকানি। ইত্যবসরে কথা বলে ওঠে রূপা, ‘জানেন, কোথাও কিছু একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে মনে হয়। হাতে মুঠোফোন আছে, কিন্তু নেটওয়ার্কের অভাবে সংযোগ বন্ধ হয়ে গেলে যেমনটা হয়—দেয়ালের ওপাশের সবকিছু অন্ধকার ও অচেনা ঠেকে, ঠিক তেমন। হুকমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর হিমুর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে আমার।’
‘আচ্ছা।’

ফুচকা খেতে খেতে রূপাকে কেমন বিমর্ষ ও বিষণ্ন দেখায়, মনের অর্গল খুলে এমন কথাও বলে ফেলে যা আসলে বলতেই চায়নি।

আসাদ কোনো কথা বলে না। নরম চোখে, নীরবে রূপার কথা শুনে যায়।

ভিজে আসে রূপার গলা, ‘একসময় ডায়েরি লিখতাম। হিমুর চরিত্র খারাপ না। আমি সয়ে নিয়েছি, মেনে নিয়েছি তার সব রকম নির্লিপ্ত স্বভাব এবং পাগলামিগুলো। কিন্তু সমস্যা হলো, ইচ্ছে হলেই তাকে যেকোনো কথা বলতে পারতাম না। হঠাৎ হঠাৎ সে ডুব দিত, আবার টুক করে হাজির। যখন তাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হতো, কোনো কথা বলতে মন চাইত, পেতাম না; তখন ডায়েরিতে কথাগুলো লিখে রাখতাম। রং দিয়ে শিল্পী যেমন ছবি আঁকে, বর্ণিল অর্থময় আল্পনায় ভরিয়ে তোলে ক্যানভাস, আমিও কল্পনা ও স্বপ্ন মিশিয়ে ডায়েরির পাতা ভরিয়ে ফেলতাম। কিন্তু এখন আর ডায়েরি লেখা হয় না।’
‘কেন?’

‘মা মারা যাওয়ার পর, আমাদের বাসায় বিষণ্ন ভুতুড়ে একটা হাওয়া ঘুরপাক খাচ্ছে প্রতিদিন। বাসায় অনেক লোকজন। কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে তেমন কথা বলে না। বাবা আমাকে খুব ভালোবাসেন, কিন্তু তিনিও সারাক্ষণ গম্ভীর মুখে বসে থাকেন খবরের কাগজ নিয়ে।’

একটা দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে আসাদ।

রূপা বলে, ‘ডায়েরি কিন্তু গোপন বাক্সের মতো। যদিও অনেক দিন পর ডায়েরি খুলে ধরলে অক্ষরগুলো কেমন বিষণ্ন দেখায়; কিন্তু ওয়ার্ডরোব থেকে যখন ওটা বের করি, পরিচিত কত মুখ ও দৃশ্য যে ভেসে ওঠে! বিশেষ করে হিমুর সরল সুন্দর চোখ। হলুদ পাঞ্জাবি। পান খাওয়া রক্তিম মুখ। তার সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তগুচ্ছ। বিশেষ কোনো কথা বা পরিকল্পনা। যে সময় একা থাকি, ডায়েরির পাতার পর পাতা উল্টাতে থাকি; মনটা আদ্র৴ হয়ে ওঠে, ভিজে আসে চোখ।’
ফুচকা শেষ করে টিস্যু পেপারে হাতে মুছতে মুছতে আসাদ বলে, ‘ডায়েরি কিন্তু অন্তরালে চর্চার বিষয়…’
রূপার ফোন বেজে ওঠে।

কথা শেষ করে দুঃখিত গলায় সরি বলে সে।
‘আজ আপনি রিকশা করে এখানে এলেন। গাড়ি কোথায়?’
‘আমার গাড়ি আছে, কে বলল?’

‘বাহ রে, আপনি তো সব সময় গাড়িতে করেই চলাফেরা করেন। হিমু ভাই বলেছে, আপনি রাস্তায় তাকে দেখে শাঁ করে তার গা ঘেঁষে গাড়ি ব্রেক কষেন এবং অনবরত হর্ন বাজাতে থাকেন। কিন্তু নাম ধরে না ডাকলে সে একবারও পিছু ফেরে না…’
‘আপনাকে দেখে মনে হয় না, আপনি হিমুর চেয়ে বড়। ওকে হিমু ভাই সম্বোধন করছেন যে?’
আসাদ একটু আরক্ত হয়, ‘বয়সে বড় না হোক, হিমু ভায়ের চরিত্রে সমীহ জাগানো কিছু ব্যাপার আছে, সবার মধ্যে থাকে না। এটা মানি তো, তাই।’

‘হুম!’
‘আচ্ছা রূপা, হিমুকে আপনি কতটুকু পছন্দ করেন?’
‘কেন?’
‘একটা পরীক্ষা নেব আপনার?’
‘নিতে পারেন।’—ফুচকা মুখে পুরে নির্লিপ্তভাবে বলে রূপা।

‘আচ্ছা বলুন তো, হিমু যে হলুদ পাঞ্জাবি পরে, পকেটবিহীন; সাধারণ পাঞ্জাবি থেকে এই পাঞ্জাবির আলাদা বিশেষত্ব কী?’
মুখের ভেতর আস্ত ফুচকা নিয়ে চোখ বড় করে তাকায় রূপা।

‘দেখুন, হিমু হলুদ পাঞ্জাবি পরে ঘুরে বেড়ায়, সেই পাঞ্জাবির একটা বিশেষত্ব নিশ্চয়ই আছে। একটা সময়ে পাঞ্জাবির রং এবং পৃথিবীর রং একরকম হয়ে যায়। অদ্ভুত স্বপ্নময় হলুদ আলোয় চারদিক ঝলমল করে ওঠে। এই আলোর আরেক নাম “কনে দেখা আলো”। কারণ এই আলোয় অতিসাধারণ চেহারার মেয়েকেও অদ্ভুত রূপবতী মনে হয়। মনে হয় পৃথিবীর সব রূপ নিয়ে সে পৃথিবীতে এসেছে।’

‘মানুষ হিসেবে হিমু তো আবেগপ্রবণ বা প্রভাবিত হওয়ার মতো নয়। এই রূপ কি সে টের পায়?’

‘আপনাকে যে ব্যাখ্যাটা দিলাম, এটা কিন্তু হুকমায়ূন আহমেদের কথা। কিন্তু আমার প্রায়ই জানতে ইচ্ছা করে, যখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হয়, পৃথিবীর রং ও হিমুর হলুদ পাঞ্জাবির রং যখন এক হয়ে যায়, সেই সময় হিমু কী করে? কী ভাবে? তার চেয়েও বড় কথা, হিমুর কাছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের বিশেষত্ব কী? আমি সত্যি জানি না। আপনি জানেন? জানলে বলুন না, প্লিজ!’

‘হঠাৎ হিমুকে খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন কেন?’
‘আছে একটু পারসোনাল ব্যাপার।’
‘বলুন না, শুনি। যদি আপনাকে হেল্প করতে পারি!’

‘বাসায় খুব ঝামেলা হচ্ছে। মেয়েরা বড় হলে অনেক সমস্যা থাকে। আপনি বুঝবেন না।’
‘কিন্তু আপনার তো হিমুর সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, ছিলও না কখনো।’
‘আপনি কীভাবে বুঝলেন?’

অবলীলায় বলে যায় আসাদ, ‘বছর আটেক আগে হিমুর বিয়ে নিয়ে কাণ্ডটা ঘটে বইমেলায়, সেখানে আপনার মতন দেখতে কেউ দূরের কথা, নামেও কোনো মিল নেই—এমন একজন মেয়েকে নিয়ে বর সেজে হিমু কনের পাশে বসেছিল…’
রূপা চশমাটা নাকের ডগায় এনে ওপর দিয়ে তাকায়। জেরা করার ভঙ্গিতে বলে, ‘আপনি আসলে কে বলুন তো!’

‘কেন?’
‘এত খবর কেমন করে জানেন আপনি?’
‘না, ওই আর কি!’
‘“ওই আর কি” জিনিসটা কী?’
সশব্দে হেসে ওঠে আসাদ।
ফুচকা শেষ করে বেয়ারাকে ডাকে রূপা, ‘ভাই, বিলটা নিয়ে আসো। শুনুন, বাসায় আমার বিয়ের কথা চলছে। এত দিন মাস্টার্স শেষ হয়নি বলে থামিয়ে রাখা গেছে। এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। হিমুকে আমার ভীষণ প্রয়োজন। আপনি ব্যাপারটা বুঝতেই পারছেন না।’
‘হিমু একটা কাল্পনিক চরিত্র। খামাকা আপনি একটা ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন।’
রূপা যন্ত্রচালিতের মতো মুঠোফোনে সময় দেখে, ‘হায় খোদা! সাড়ে আটটা বেজে গেছে। চলুন, ওঠা যাক।’
আসাদ বলে, ‘আমার আরেকটু কথা ছিল…’
‘বলুন।’
‘হিমু বলে কেউ নেই, ছিলও না কখনো।’
‘প্রমাণ কী?’

‘হিমুর বয়সের প্রতিটি নাগরিক তরুণ যখন ক্যারিয়ার আর করপোরেট স্বপ্নে বিহ্বল, সে তখন নেহাতই পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে খালি পায়ে ঘুরে বেড়ায়। খয়ের দিয়ে পান খায়। এসব পাগলামি ছাড়া আর কিছু হতে পারে?’
‘আপনার কি মনে হয় আমি পাগল?’
‘তা ঠিক নন, তবে আপনার বিভ্রম ঘটেছে।’
‘কী রকম?’
‘হিমুর মতো ছেলের সঙ্গে কারও প্রেম হওয়া সম্ভব নয়।’
‘কেন?’

‘কারণ হিমু হওয়ার জন্য অনেক শর্ত পালন করতে হয়। একটা শর্ত এ রকম যে হিমুরা কখনোই কোনো তরুণীর সঙ্গে হৃদয়ঘটিত ঝামেলায় জড়াবে না। একসঙ্গে ফুচকা খাওয়া, ফাস্টফুড খাওয়া ইত্যাদিও নিষেধ।’
‘দেখুন মিস্টার ফ্যাসাদ সাহেব, প্রেম হতে ফাস্টফুডে যেতে হয় না।’—রূপার গলার ঝাঁজ টের পাওয়া যায়।
‘কী বললেন? আমার নাম ফ্যাসাদ নয়, আসাদ। আর হুটমায়ূন আহমেদের ভাষাতেই বলি, হিমুর কাজকর্ম রহস্যময় জগৎ নিয়ে। সে চলে অ্যান্টি-লজিকে। সে বেশির ভাগ সময়ই বাইরে বাইরে ঘোরে। রাত জেগে পথে পথে হাঁটে, কিন্তু সে-ই সবচেয়ে বেশি অন্তর্মুখী। মিসির আলি চোখ বন্ধ করে পৃথিবী দেখেন। আর হিমু চোখ খোলা রাখে কিন্তু কিছুই দেখে না।’
‘আর কিছু?’

‘হুখমায়ূন নিজেই স্বীকার করেছেন, হিমু দেখতে কেমন তিনি জানেন না। কোনো বইয়ে হিমুর চেহারার বর্ণনা নেই। যা আছে তাও খুব সামান্য। সে বর্ণনা থেকে চরিত্রের ছবি আঁকা যায় না। আমার নিজের মনে যে ছবিটি ভাসে তা হাসিখুশি ধরনের এক যুবকের ছবি। যে যুবকের মুখে আছে কিশোরের সারল্য। শুধু চোখদুটি তীক্ষ্ণ। সেই চোখে কৌতুক ঝিকমিক করে। সবকিছুতেই সে মজা পায়।’

রূপা কথা বলে না। গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে।
আসাদ বলে, ‘আপনি কি জানেন, হিমু সিরিজের বই লেখার জন্য হুনমায়ূনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং আদালত থেকে তাঁকে তলবও করা হয়েছিল?’
‘না তো! কী বলছেন এসব?’

আসাদের ভঙ্গি পণ্ডিতের মতো, নির্বিকার, ‘দরজার ওপাশে নামে হিমু সিরিজের যে বই আছে, সেই বইয়ের একটি বর্ণনা এমন, “…জজ সাহেবরা ঘুষ খান।” বইটি প্রকাশের পর তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়।’
রূপার ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছে। বলল, ‘আপনার উদ্দেশ্যটা আসলে কী?’
‘উদ্দেশ্য! না, কোনো উদ্দেশ্য তো নেই।’
‘যথেষ্ট অনর্থক বকেছেন। আপনি হিমুকে চেনেন শুনে এতটা সময় কথা বললাম, একসঙ্গে বসে ফুচকা খেলাম। আর আপনি…’
‘আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন, মিস রূপা!’
‘আপনি যে বললেন, হিমুকে চেনেন? সে আপনার বাসার পাশের মেসে থাকে? এসব কি মিথ্যে বলেছেন?’
আসাদ অন্যমনস্ক হয়ে মাথা চুলকাতে থাকে।
রূপার কণ্ঠ প্রায় গর্জে উঠল, ‘কথা বলছেন না কেন?’

‘এই মিথ্যেটুকু না বললে তো আপনি আমাকে পাত্তা দিতেন না! ধরুন, আমি একটা মিথ্যে চরিত্র। তাই ধরা খেয়ে গেলাম। কিন্তু হিমু নানা রকম সমস্যায় পড়ে এবং প্রায় অলৌকিকভাবে মুক্তি পেয়ে যায়। আপনার কী ধারণা, বাস্তবে এমন সম্ভব?’

মিষ্টি করে হেসে ওঠে রূপা, ‘আরে ধুর, হিমু কখনো জটিল পরিস্থিতিতে পড়ে না। তবে ছোটখাটো ঝামেলায় সে পড়ে। সেসব ঝামেলা তাকে স্পর্শও করে না। সে অনেকটা হাঁসের মতো। ঝাড়া দিল, গা থেকে ঝামেলা পানির মতো ঝরে পড়ল।’
বিল মিটিয়ে রূপা দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামে।

রাত নয়টার মতো বাজে। ওভারব্রিজ পেরিয়ে সে আবার মোস্তফা ভায়ের দোকানে আসে। দেখে, দোকানপাট সব বন্ধ। মোস্তফা ভাই নেই।
আসাদকেও আর দেখতে পাওয়া যায় না রূপার পাশে।
গাঢ় ভঙ্গিতে রাত নামতে থাকে।

তখন, হঠাৎই কবিতার মতো দুটো লাইন মাথায় উঁকি দেয় রূপার, ‘আজ দেখো তোমার পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কে/ এর জন্য এতটা পথ হেঁটে এসেছ তুমি।’
রূপা পাশ ফিরে তাকায়, কোথাও কেউ নেই।

 

Leave a comment

Advertisement
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook

মাসুমা রহমান নাবিলা (Masuma Rahman Nabila)। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা3 months ago

‘আয়নাবাজি’র নায়িকা মাসুমা রহমান নাবিলার বিয়ে ২৬ এপ্রিল

‘মিথ্যে’-র একটি দৃশ্যে সৌমন বোস ও পায়েল দেব (Souman Bose and Payel Deb in Mithye)
অন্যান্য3 months ago

বৃষ্টির রাতে বয়ফ্রেন্ড মানেই রোম্যান্টিক?

Bonny Sengupta and Ritwika Sen (ঋত্বিকা ও বনি। ছবি: ইউটিউব থেকে)
টলিউড3 months ago

বনি-ঋত্বিকার নতুন ছবির গান একদিনেই দু’লক্ষ

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)
অন্যান্য3 months ago

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)

ভিডিও4 months ago

সেলফির কুফল নিয়ে একটি দেখার মতো ভারতীয় শর্টফিল্ম (ভিডিও)

ঘটনা রটনা5 months ago

ইউটিউবে ঝড় তুলেছে যে ডেন্স (ভিডিও)

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌'কথার কথা' (প্রমো)
সঙ্গীত6 months ago

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌’কথার কথা’ (প্রমো)

সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া
সঙ্গীত6 months ago

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান গাইলেন সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া

মাহিমা চৌধুরী (Mahima Chaudhry)। ছবি : ইন্টারনেট
ফিচার7 months ago

এই বলিউড নায়িকা কেন হারিয়ে গেলেন?

'সেক্সি মুভস না করে বরং পোশাক ছিঁড়ে ক্লিভেজ দেখাও'
বলিউড7 months ago

‘সেক্সি মুভস না করে বরং পোশাক ছিঁড়ে ক্লিভেজ দেখাও’

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম