Connect with us

গল্প

স্টেথোসকোপ | আবিদ করিম মুন্না

Published

on

স্টেথোসকোপ | আবিদ করিম মুন্না

 

শহরের পায়রা চত্বরের বেশ পুরোনো টেইলার্স। নামটাও অন্যরকম- লালিয়া। হ্যাঙ্গারে ঝুলছে মেডিকেল অ্যাপ্রন। মেডিকেল স্টুডেন্ট থেকে ডাক্তার সবারই নিত্য আসা-যাওয়া এখানে। পরম মমতায় অ্যাপ্রন তৈরিতে ব্য মকবুল হোসেন দরজি। ইদানিং অ্যাপ্রন ডাক্তার কিংবা মেডিকেল স্টুডেন্টদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আজকাল অ্যাপ্রন পরা কাউকে দেখলে দূর থেকে বোঝার উপায়ও থাকে না, তার কারণ অ্যাপ্রন এখন স্বাস্থ্যকর্মী থেকে স্কুল, কলেজ স্টুডেন্ট এমনকি গার্মেন্টকর্মী পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

সুদৃষ্টিতে তাকালে মেডিকেল স্টুডেন্ট হলে একটা নির্দিষ্ট সময় থেকে স্টেথোসকোপ অ্যাপ্রনের পকেটে, নয়তো হাতে নতুবা গলায় ঝোলানো থাকবে।

এমন দৃশ্য রিমেলকে স্বপ্ন দেখাতো। স্বপ্ন দেখাটাও শুরু হয়েছিল সেই ছোটোবেলায়, বাবা-মার সঙ্গে দূরদর্শনে উত্তম কুমার আর সুচিত্রা সেন অভিনীত ডাক্তারদের জীবনকাহিনি নিয়ে তৈরি ছবি দেখে। পৌঁছে গিয়েছিল স্বপ্নের বন্দরে। স্বপ্নের নোঙ্গর করা হলো না।

এক জনমে মানুষের সব আশা পূরণ হয় না। স্বাধীনচেতা যুবক ঢাকায় এসে পত্রিকায় ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে সুনাম কুড়ালো। পত্রিকায় ছদ্মনামে রিপোর্ট ছাপা হতো। পাঠকেরাও থাকত দারুণ উদগ্রীব। কে এই রিপোর্টার? নিপুণ হাতের অসাধারণ রিপোর্টিং।

রিমেলের পুরো নাম রফিক হাছনাইন। আজ দৈনিক লাল সবুজের ভোর পত্রিকার ‘আমরা করবো জয়’ পাতায় একটি ছড়া পড়ে মন খারাপ হলো। ‘জান্নাতবাসী’ শিরোনামে নিশাত ফারহানা নিঝুমের হৃদয়ছোঁয়া লেখাটি পরলোকগত বাবাকে নিয়ে-

বাবা তুমি চলে গেছো
আজ ১৮ বছর হলো
তোমার দেয়া স্মৃতিগুলো
ভীষণ এলোমেলো।

৯৯-এর ২৭ ডিসেম্বর
তুমি চলে গেলে
নিষ্ঠুর এই পৃথিবীতে
আমায় একা ফেলে।

এমনি করে আর কতকাল
থাকবো বাবা একা
তোমায় ছাড়া কেমন করে
যায় গো বলো থাকা।

বাবা আমার ওগো বাবা
এসো তুমি ফিরে
মন মাঝারের কষ্টগুলো
দেখাবো তোমায় চিড়ে।

জানি বাবা আসবে না আর
নিতে আমায় কোলে
তোমায় হারার কষ্টটাকে
থাকতে হবে ভুলে।

তোমার তরে শ্রদ্ধা আমার
সালাম রাশি রাশি
দোয়া করি তুমি যেন
হও জান্নাতবাসী।

 

লেখাটা পড়ে যে কারোই মন খারাপ হয়ে যায়। পাতাটির বিভাগীয় সম্পাদক সালেহ্ বায়েজীদ ভাই। নিঝুম নামের মেয়েটির কনট্রাক্ট নাম্বার চেয়ে নিলেন। সন্ধ্যার পর ফোন দেয়। রিসিভ করে মা ফারহানা মাহমুদ। ইন্টারমিডিয়েট দেবে নিঝুম। আরও জানতে পারে ওর বাবার স্বাভাবিক মৃত্যু হয় নি।

নানা কারণে সময় হয়ে ওঠে না। একদিন হলো। নিঝুমেরা দু বোন। বড়োবোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ভাবে ওর মায়ের গর্ভে যদি জন্ম হতো। ফারহানা মাহমুদ বুঝেছেন এই ছেলে আর দশটা ছেলে থেকে অন্যরকম। মায়ের স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে কাছে টেনে নেন। ইচ্ছে হয় নিঝুমের সঙ্গে ঝগড়া, ওকে শাসন, আদর করতে, কখনও চুটিয়ে আড্ডা দিতে।

নিঝুমের স্বপ্ন ডাক্তার হবার। রিমেলেরও ছিল। কল্পনায় আঁকতে চেষ্টা করে মেডিকেল স্টুডেন্ট নিঝুমকে। হয়ত ক্লাসে পুরোনো একটা লাশ দেখে নিজেই ভূপাতিত। সব ভয়ভীতি কাটিয়ে পড়াশোনায় নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়া। ফার্স্ট ইয়ার সেকেন্ড ইয়ার পেরিয়ে একদিন হাফ ডাক্তার মানে থার্ড ইয়ার। অ্যাপ্রন গায়ে চাপিয়ে স্টেথো নিয়ে হোস্টেল থেকে কলেজ আবার কলেজ থেকে সকাল-সন্ধ্যায় হাসপাতালের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ছোটা।

একদিন মেডিকেল কলেজে পা রাখল। ক্যাম্পাসটাও বেশ চমৎকার। রাস্তার দু ধারে সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ যেন আকাশ ছুঁয়েছে। কলেজের ফার্স্ট ব্যাচের স্টুডেন্ট আর সেই সময়ের টিচাররা মিলে লাগিয়েছিল। ফোটে রক্তলাল কৃষ্ণচূড়া, হলুদ সোনালু এবং বেগুনি জারুল। গ্রীষ্মে তিন রঙের ফুলগাছের সারি অপূর্ব লাগে। আছে মে ফ্লাওয়ার বা লাল সোনাইল ফুল গাছ। মে মাসে গোলাপি এই ফুলটি যখন পুরোপুরি ডানা মেলে তখন কোনো পাতাই আর চোখে পড়ে না। চোখে পড়বে শহরের সবচেয়ে বড়ো গাছ নারিকেলী কাঠবাদাম। গাছটির অন্য নাম বুদ্ধ নারিকেল। কেউ কেউ কাশ্মিরী নারিকেল গাছ নামেও চেনে।

ওরিয়েন্টেশনের আগে অনুরোধ করল গার্ডিয়ান হিসেবে যেন তাকে সঙ্গে নেয়া হয়। একটুও অমত করলেন না ফারহানা মাহমুদ। চমৎকার প্রোগ্রাম হলো। নবাগতদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হচ্ছিল অ্যানাটমি, ফিজিওলজি আর বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগ…। ফার্স্ট ইয়ারে এই বিষয়গুলোই পড়ানো হবে।

রিমেলও সুযোগটি নিয়েছিল সবার সাথে মিশে গিয়ে। মেডিকেল কলেজের আঙ্গিনায় এ জীবনে ডাক্তার হিসেবে তো নয়ই, স্টুডেন্ট হয়ে আসারও কোনো সুযোগ আর নেই। একমাত্র অভিনয়ে নাম লেখালে হয়ত সম্ভব হতো। চোখে পড়ে মর্গ। কোনো ডেডবডি আছে কিনা, একজনের কাছ থেকে উত্তর আসে- ছিল একটা, ট্রেনে কাটা পড়া একজনের…।

ওরিয়েন্টেশন শেষে হোস্টেলের নির্ধারিত রুম দেখে এলো। যদিও মায়ের ইচ্ছে মেয়ে বাসায় থেকেই লেখাপড়া করুক। রিমেলেরও একই মত। ফারহানা মাহমুদকে জানায়, লেখাপড়ার সব খরচ আজ থেকে তার। খাওয়াদাওয়া আর টুকিটাকি…।

লালিয়া টেইলার্স থেকে অ্যাপ্রন বানানো হলো। ঢাকার নীলক্ষেত থেকে কেনা হলো মেডিকেলের প্রয়োজনীয় বই।

অ্যানাটমির ডিসেকশন ক্লাসের প্রথম দিনেই লাশ দেখে মাথা ঘুরে পড়ে গেল। শেষে স্ট্রেচারে করে…।

সময় পেরিয়ে যায়। নিঝুমও হাফ ডাক্তার হবার পথে। ফোনে জানায়, ভাইয়া- শীঘ্রই ওয়ার্ড ক্লাস শুরু হয়ে যাবে, স্টেথোসকোপ আর বিপি মেশিন কিনে খুব তাড়াতাড়ি পাঠাও।

গুগল সার্চে দেখেছিল কত বিচিত্র রং আর ঢঙের স্টেথোসকোপ। ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের উলটোদিকে বিএমএ ভবন মার্কেট এবং মিডফোর্ডের দিকে কিনতে পাওয়া যায়। এক ডাক্তার বন্ধু এমনটাই বলেছে স্টুডেন্টদের খুব মূল্যবান স্টেথো ইউজ না করাই ভালো। কেননা ওয়ার্ড ক্লাসে প্রায়ই হারিয়ে ফেলে। সোজা বাংলায় চুরি…। হারিয়ে যাতে না যায় এজন্য অনেকেই স্টেথোর ডায়াফ্রামে নিজের নামটা ছোট্ট করে লেখার পাশাপাশি ব্যাচ নাম্বারও লিখে রাখে।

রিমেলের মনে হয় সব রঙের যদি একটা করে কিনতে পারত! ড্রেসের সঙ্গে প্রতিদিন ম্যাচ করত। অ্যাপ্রন গায়ে চাপিয়ে স্টেথো হাতে কিংবা গলায় ঝুলিয়ে ছুটত এই ওয়ার্ড থেকে সেই ওয়ার্ডে। কিন্তু সব পাগলামিরও একটা সীমা আছে। চাওয়া মানে তো আর পাওয়া নয়। তাছাড়া এই অযৌক্তিক স্বপ্নটি বাস্তবায়ন করতে গেলে কী পরিমাণ মুদ্রা অপসারিত হবে সেটাও ভাববার বিষয়।

নিঝুমের পছন্দের সাথে রিমেলের অদ্ভুত একটা মিল আছে। দুজনেরই পছন্দ টিয়ে রং। নিঝুমের জন্য টিয়ে রঙের একটা স্টেথোসকোপ কিনে ফেলল সাড়ে ছয় হাজার টাকায় আর বসুন্ধরা সিটি থেকে ম্যাচ করে থ্রিপিস।

ফেসবুক-এ প্রায়ই দুজনের যোগাযোগ হয়। হোস্টেলে আড্ডা, কলেজ করিডোর, ক্লাসের গ্যালারি, জন্মদিনে কেক কাটা, ইয়ার এন্ডিং র‌্যালি, শর্ট ফিল্মের শুটিং, মেঠোপথ, ক্যান্টিনে চা খাওয়া, দিনাজপুরে বান্ধবীর গ্রামের বাড়িতে লিচু খেতে যাওয়া, রাজশাহীতে আরেক বান্ধবীর বাড়িতে মধুমাসের ফল আম খেতে যাওয়া, শহিদ মিনারে প্রভাত ফেরি ছাড়াও অডিটরিয়ামে কবিতা পাঠ, বিতর্ক প্রতিযোগিতার অনেক ছবি পোস্ট করেছে নিঝুম।
কিন্তু রিমেল যে ওকে দেখতে চায় ডাক্তারের বেশে।

একদিন মুঠোফোনে বার্তা পাঠায়। জবাবও আসে বেশ দ্রুত ‘অ্যাপ্রন পোজ দেয়ার জিনিস না ভাইয়া। আমার অ্যাপ্রন পরা কোনো পিকচার নেই। স্টেথো গলায় ঝুলিয়ে পিকচারও নেই। আই রিয়েলি হেইট শোডাউন।’

টেক্সটটা পেয়ে কষ্ট পায়। কী আর হতো ভাইয়ার ছোট্ট চাওয়াটা পূরণ করলে। যোগাযোগটাও কিছুটা কমে আসে। এর মাঝে নিঝুমের বাবার হত্যা রহস্যের একটা কিনারাও খুঁজে পায় রিমেল।

ফারহানা মাহমুদকে বিশেষভাবে অনুরোধ করে তারা যেন সাবধানে পথ চলে।
কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলে না নিঝুম। নোটিশ বোর্ডে এমবিবিএস পরীক্ষার ফলাফল মাকে জানিয়ে ভাইয়াকেই প্রথম এসএমএস করে- ‘বাবা-মা আর তোমার এতদিনের লালিত স্বপ্ন হলো পূরণ। সবাই অনেক খুশি তবুও মায়ের চোখে পানি। বাবা জানে না তার ছোট্ট মামণি আজ একজন ডাক্তার। আমার ভাইয়া আমার জন্য অনেক কিছু করেছে। তার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।’

ইন্টার্নি করার সময় বিসিএস ভাইভাটাও হয়ে যায়। পাশাপাশি মেডিকেল প্র্যাকটিসটা যাতে চালিয়ে নিতে পারে এজন্য শহরের একটা ফার্মেসিতে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর বসে। দিনে দিনে একটা দুটো থেকে পেশেন্টও যায় বেড়ে।

প্রতিধ্বনি টেলিভিশন ইদানিং নিউজ খুব ভালো প্রেজেন্ট করছে। বিশেষ করে বিভাগীয় শহরগুলোর আপডেট মুহূর্তেই প্রচারে তারা অন্য চ্যানেলগুলোর চেয়ে অনেকটা এগিয়ে।

অফিসেই ছিল রিমেল। হঠাৎ ব্রেকিং নিউজ- ‘রোগী সেজে রংপুরে হত্যার চেষ্টা। নিহত ২। নিশাত ফারহানা নিঝুম নামের তরুণী এক চিকিৎসক গুরুতর আহত। আশঙ্কাজনক অবস্থায় এয়ার অ্যামবুলেন্স-এ ঢাকা নেয়া হচ্ছে। শহরের পরিবেশ থমথমে। আহত ৩।’
রাত দশটার নিউজ দেখার অপেক্ষা করছে।

সিসিটিভিতে ধারণকৃত এক্সক্লুসিভ ভিডিও ক্লিপে দেখা যাচ্ছে- পেছন থেকে পিঠে ছুরি মারছে এক মুখোশধারী…। অচেতন অবস্থায় অ্যাপ্রন পরা রক্তাক্ত নিঝুম মেঝেতে…। গলায় সেই টিয়ে রঙের স্টেথোসকোপ…।

রিমেল চুপ মেরে গেল। তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। তার চোখ বেয়ে জল ঝরছে। নিঝুমকে কোনোদিন লুকানো ভালোবাসার কথা বলা হলো না।

রিমেল পাগল হয়ে যায়।

 

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook

(ভিডিও)
অন্যান্য1 week ago

আলোচনায় ‘রস’ (ভিডিও)

মাসুমা রহমান নাবিলা (Masuma Rahman Nabila)। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা4 months ago

‘আয়নাবাজি’র নায়িকা মাসুমা রহমান নাবিলার বিয়ে ২৬ এপ্রিল

‘মিথ্যে’-র একটি দৃশ্যে সৌমন বোস ও পায়েল দেব (Souman Bose and Payel Deb in Mithye)
অন্যান্য4 months ago

বৃষ্টির রাতে বয়ফ্রেন্ড মানেই রোম্যান্টিক?

Bonny Sengupta and Ritwika Sen (ঋত্বিকা ও বনি। ছবি: ইউটিউব থেকে)
টলিউড4 months ago

বনি-ঋত্বিকার নতুন ছবির গান একদিনেই দু’লক্ষ

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)
অন্যান্য4 months ago

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)

ভিডিও6 months ago

সেলফির কুফল নিয়ে একটি দেখার মতো ভারতীয় শর্টফিল্ম (ভিডিও)

ঘটনা রটনা6 months ago

ইউটিউবে ঝড় তুলেছে যে ডেন্স (ভিডিও)

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌'কথার কথা' (প্রমো)
সঙ্গীত7 months ago

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌’কথার কথা’ (প্রমো)

সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া
সঙ্গীত7 months ago

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান গাইলেন সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া

মাহিমা চৌধুরী (Mahima Chaudhry)। ছবি : ইন্টারনেট
ফিচার8 months ago

এই বলিউড নায়িকা কেন হারিয়ে গেলেন?

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম