Connect with us

প্রবন্ধ

বাঙালির অন্তর্গত বিরোধ-স্ববিরোধ | রোখসানা চৌধুরী

Published

on

বাঙালির অন্তর্গত বিরোধ-স্ববিরোধ | রোখসানা চৌধুরী

কোন এক বিদেশি টিভি চ্যানেলের তাৎক্ষণিক জরিপ অনুষ্ঠানে একটি প্রশ্ন ছিলো। ‘‘Honesty or Diplomacy, What do u think?’ অমূল্য প্রশ্ন, সন্দেহ নেই। কারণ, অবস্থানগত বৈপরিত্যে ব্যবহৃত নতুন শব্দটি এক বিশেষ মনোভাবের জন্ম দিয়েছে। সততার বিপরীতে অসততার অস্তিত্ব পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত। মানে আজকের পৃথিবীতে সবার অলক্ষ্যে সততার বিপরীতে এক নতুন ধারণার জন্মলাভ ঘটেছে। যার নাম ডিপ্লোম্যাসি বা কূটনীতি। কিন্তু বাঙালি এমত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে এখনো প্রস্তুত নয়। কূটনীতি আমাদের কাছে কূটনামির চাইতে বেশি কিছু নয়। ‘কূট’ শব্দের অর্থ বিষ। কাজেই Diplomacy শব্দের বাংলা পারিভাষিক শব্দ নির্ধারণেই আমাদের মনোভাব স্পষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের মগজ ধারণ করে আছে আদর্শলিপি। অথচ জীবনযাপনে চেষ্টা করছি ডিপ্ল্যোম্যাটিক হতে। ফলাফল বাঙালির অনিবার্য দ্বন্দ্ব বিদীর্ণ জীবন।

২.
আর সেই ডিপ্লোম্যাসি চর্চার স্থান শহর, গ্রাম নয়- এটা সকলেরই জানা। আমরা নগর বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলি, ভাবি প্রায়শই। অথচ বিষয়টি দানা বাঁধে না। আমরা আসলে নগরকে অন্তস্থল থেকে গ্রহণ করতে পেরেছি কি? ঈদে-পার্বনে বাঙালির সাজ সাজ রবে বাড়ি ফেরা, কথিত শিকড়ের টানই প্রমাণ করে দেয়, সঠিক নগরায়ণ হয়ে-না-ওঠার কারণ। কারণ, নগরায়ণ মানে কেবলি দর-দালান আর পাকা রাস্তাঘাট নয়। আধুনিক যুগ-পূর্ব লোকসাহিত্যে ‘নাগর’ শব্দটি প্রচলিত হয়েছিলো নগর থেকে আগত প্রতারক প্রেমিকের নামকরণে। অর্থাৎ, নগর মানেই প্রতারণার রূপক হয়ে সাধারণের মনে মুদ্রিত হয়েছিলো।

অথচ নগরায়ণের সূত্রপাত ব্রিটিশ আগমনেরও শতবর্ষ পূর্বেকার হলেও নগর ও গ্রামের দূরত্ব চিরকাল শোষক-শাসিতের অনুরূপ রয়ে গেছে। তাই নগর জীবিকার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলেও আত্মীয়তা গড়ে ওঠেনি নগর ও গ্রামের ভেতর।

এক ধরনের শীতল নিষ্ঠুরতার আবেষ্টন ঘিরে থাকে শহরের প্রকট বৈষম্যগুলোর ভেতর। পাঁচতারা হোটেলের পাশেই মানবেতর বস্তি, ঝাঁ-চকচকে শপিং কমপ্লেক্সের পাশেই ফুটপাথের হাওয়াই মিঠাই রঙা পসরার দুঃখ ভুলতে নামহীন নম্বরওয়ালা মানুষগুলো বাস-ট্রেন-লঞ্চের ছাদে চড়ে বসে। সেমাইয়ের প্যাকেটসহ পানির নিচে তলিয়ে যাবার আশঙ্কাকে বুকে রেখেই।

জীবনানন্দ দাশের ‘জলপাইহাটি’ উপন্যাসে দেখা যায়, গ্রাম থেকে আসা চাকরি প্রত্যাশী বন্ধুকে ধনীবন্ধু টিটকারি দিচ্ছে-
‘যত মফস্বলের লোকজন আজকাল শহরে এসে নিরিবিলি খোঁজে।’

গ্রাম থেকে বানের জলে ভেসে আসা কর্মহীন মানুষেরা শহরের ড্রইংরুম সংস্কৃতিতে ক্রমাগত আপোস করতে করতে মাইকেল জ্যাকসনের মত শ্বেতাঙ্গ মনের সাথে সাথে শ্বেত চামড়ার মুখোশ ধারণ করে ‘নগর’ জীবনে গড্ডল  স্রোতের একজন হয়ে ওঠে।

৩.
মুখোশ ক্ষণস্থায়ী, একসময় অপসৃত হয়েই যায়। মুখোশ সরে গিয়ে একসময় জেগে ওঠে নারকীয় নৃশংসতার অধ্যায়। নির্দয় অপরাধ প্রবণতা ক্রমেই বাঙালি সংস্কৃতির (সংস্কৃতিকে যদি জীবন-যাপনের অংশ বলে ধরে নেয়া হয়) চর্চার একটি অংশ হয়ে উঠছে। আমরা যেন নির্ধারণ করে নিয়েছি যে, খুন-ধর্ষণের মতো বীভৎস নিষ্ঠুরতার স্বাভাবিক একটি মাপকাঠি রয়েছে। তাই যতদূর পর্যন্ত সয়ে নেয়া যাচ্ছে, ততদূর পর্যন্ত খবরগুলো যথাসম্ভব পত্রিকার ভেতরের পাতায় জায়গা করে নিচ্ছে। মনোযোগের পরিধিবৃত্তের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

যেমন-কোনো মা যদি নিজ সন্তানকে হত্যা না করে অপরের সন্তানকে হত্যা করে, হতে পারে আপন ভাই-বোনেরই সন্তান, অথবা পিতা যদি নিজ কন্যাকে ধর্ষণ না করে অপরের কন্যাকে ধর্ষণ করে তাহলে সেগুলো অন্তত অবিশ্বাস্য ও দুর্লভ নয়। তার মানে বিষয়টা দাঁড়াচ্ছে যে, বাংলাদেশে এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকা খুন, ধর্ষণ, চোখ উপড়ানো, অ্যাসিডে ঝলসানো ইত্যাকার ঘটনাগুলো আমাদের কাছে এতটাই সহনীয় আর বিশ্বাস্যতার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, এগুলো আর টিভি চ্যানেলের ‘ব্রেকিং নিউজ’ হতে পারে না এবং সমবেত জনতাকে আর যথেষ্ট পরিমাণে রোমহর্ষক অনুভূতিতে জাগিয়ে তুলতে পারে না। অর্থাৎ মৃত্যুই কেবল নয়, হত্যাকাণ্ড-রও স্বাভাবিকীকরণ ঘটেছে। স্বাভাবিক মৃত্যুর শোক তো দূরে, স্বাভাবিক  শোকও আমরা সামলে উঠেছি। আমরা যতই সমালোচনা করি না কেন,  বিশ্বজিৎ হত্যা কিংবা রাজন নির্যাতন দৃশ্যের ছবি বা ভিডিও ছিল বলেই কিন্তু তাদের জন্য উপযুক্ত পরিমানে আবেগাক্রান্ত হতে পেরেছি। অথচ এমন অগণিত ঘটনা, যা প্রতিদিন প্রিন্ট মিডিয়ায় ছাপা হচ্ছে তা চায়ের চুমুকের অবসরে পাতা উল্টে ভুলে যাচ্ছি হরহামেশা।

পরোক্ষভাবে একটি জনগোষ্ঠী সকল প্রকার নির্দয়তাকে আত্তীকরণ করে চলেছি। পরোক্ষভাবে পিতা-মাতার উপর কেবলি নিজ সন্তানকে দুধে-ভাতে রাখার স্বার্থপর ভাবনাটি মাহাত্ম্যের মোহে আবিষ্ট করে রাখছি।

যদিও বর্তমান দেশ-কাল-পরিস্থিতি নিয়ে হতাশাগ্রস্ত না হবার কোন কারণ নেই, তবুও খুব জানতে ইচ্ছা হয় যে, ইতিহাসে সত্যযুগ বলে বিবেচিত ছিল কোন সময়টি? যখন সতীদাহ ছিলো? যখন কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো? কুলীন ব্রাহ্মণের মৃত্যুতে শতাধিক স্ত্রী বিধবা হত? অথবা অবরোধের নামে মেয়েদের চিড়িয়াখানায় জীব বানিয়ে রাখা হতো? টাকায় যখন আটমন চাল পাওয়া যেত বলে শোনা যায়, তখন কি টাকায় সবকিছু কেনাবেচা হত? টাকা কি আদৌ তখন অর্থনীতির মাপকাঠি হয়ে উঠেছিল? ভারতবর্ষ স্বাধীনতা হারিয়েছিলো অল্প ক’জন মানুষের বিশ্বাসঘাতকতায়, কোটি আমজনতা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিলো, সেটিই কি আমাদের তথাকথিত সত্যযুগ?

এই তালিকা অশেষ, মানুষের সভ্যতার দ্বিগুণ বয়সী মানুষের অসভ্যতা। আর সভ্যতার সঙ্গে আধুনিকতার সম্পর্ক রয়েছে বৈ কি। গুহামানবকে তো আর আধুনিক বলা যাবে না। কিন্তু অধুনা সময়ে দাঁড়ানো, সর্বপ্রকার আধুনিক সুবিধাদি গ্রহণকারীকেই আধুনিক বলা যাবে কি? বংশকাণ্ডের ছায়ামূর্তি প্রিন্স চার্লস কি আধুনিক, নাকি নিজস্ব ব্যক্তিসত্তাকে মুক্তি দিতে ‘হার হাইনেস’ উপাধি পদবি পরিত্যাগ করে রয়্যাল পরিবারের শক্ত বেষ্টনি ভেঙে বেরুনো প্রিন্সেস ডায়ানা আধুনিক?

 

৪.
‘আধুনিকতা’ নিয়ে তাই বিভ্রান্তির শেষ নেই। মূলত, ব্যক্তির একাকী, বিচ্ছিন্ন সত্তাই তার ব্যক্তিত্ব। আধুনিকতা মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নির্মাণ করে, ধারণ করে। আমরা শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র নির্মাণে পোশাক-আশাক, খাদ্যাভ্যাস সব মিলিয়ে একধরনের ইকেবানা ড্রইংরুম সংস্কৃতিকে আধুনিকতা ভেবে আহাদিত। আদতে আমরা এখনো ভিড়ের মানুষই রয়ে গেছি। গড্ডল প্রবাহে প্রবাহিত।

‘অ’ উচ্চারণে অজগরের ভয়ে কম্পিত হয়ে যাই। আবার ‘আ’ উচ্চারণেই পরিস্থিতি সম্যক উপলব্ধি ছাড়া আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আকাশের দেবতার রোষে অতিবর্ষণ হয়, শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। পৃথিবীর দেবতাদের যোগসাজশে বৃক্ষহীন পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যায়- খরা হয়। হিমালয়ের বরফ গলে যায়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জটিল বন্ধুত্বে জলের হিসাব নিকাশ মেলেনা- তখন বন্যা হয়। আরো আছে জলজট, যানজট, জনজট। মাঝে মাঝে ভূমিকম্প এসে হৃৎকম্প ধরিয়ে দিয়ে যায়। আমরা প্রতিবাদও করি। কিন্তু, আমাদের প্রতিবাদ, মানে সম্মিলিত অভিযোগের গুণগুণানি। কিন্তু মূলত আমরা নেতৃত্বের প্রত্যাশী। সেই নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক কর্পোরেট নেতৃত্ব নয়। বরং সেই নেতৃত্বের কাঙ্ক্ষিত ইমেজ বা চেহারা আপাদমস্তক দেবত্বে উত্তীর্ণ। আমরা ভিড়ের মানুষ থেকে ব্যক্তিত্বে উত্তীর্ণ হতে পারিনি আজো। তাই ‘মধ্যযুগীয়’ বলে গালি দিলেও নেতৃত্বের দেবমূর্তির প্রতি আচ্ছন্ন বিশ্বাসে ব্যক্তিপূজার সমাপ্ত হয়নি কখনোই। তারই বিষময় ফল ফলছে আজ চারপাশ জুড়ে।

আমাদের কাছে প্রশাসক দেবতা, নেতা দেবতা, পাতি নেতাও দেবতা, প্রয়াত নেতা তো পরমেশ্বর ভগবান। অতএব, ফুলে-জলে-সন্দেশে তোষণ। অতএব ভিন্ন ধর্মের মতো ভিন্ন দল বা গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত কূপমণ্ডূক আচরণ, ফলাফল এখানেও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প উদগীরন। আবার দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে অন্য দৃশ্য। তখন অদৃশ্য প্রায় দেবতার নেতৃত্বের প্রতি ঘৃণা বর্ষণ করে আমাদের দায়িত্ব সমাপন।

ভিড়ের মানুষের আত্মসমালোচনার দায় নেই। সুবিধা দ্বিবিধ, প্রথমত সে তার দৈনন্দিন জীবনের প্রতি মুহূর্তের হেরে যাওয়াকে এক হাত দেখে নিতে চায়্ টি-স্টলে, বাসের গাদাগাদি ভিড়ে, মিছিলের স্রোত , শ্রাব্য-অশ্রাব্য ভাষায় সে নিজেকে জানান দিয়ে মর্ষকামী আনন্দ লাভ করে। দ্বিতীয়ত, ভিড়ের মাঝে সুযোগ বুঝে মুখ লুকিয়ে ফেলা যায় চট করে, ভিড়ের মানুষ কিংবা মঞ্চে উপবিষ্ট নেতা, কেউই টের পায় না।

৫.
তবুও, অন্তত তিনজন বাঙালির নাম করা যায়। আত্মসমালোচনার দিক থেকে যারা সেরা বলে বিবেচিত। তারা হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন।

আরবি, ফার্সী, উর্দু সর্বোপরি ইংরেজির সর্বগ্রাসী দৌরাত্ম্য আর আধিপত্যের ভেতর বিদ্যাসাগর এবং বেগম রোকেয়া উভয়ই বাংলা ভাষাকে শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার বাহন রূপে সম্মানিত করেছেন। অথচ স্বাধীন দেশে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজির একচেটিয়া প্রাধান্যই শুধু নয়, বরং ইংরেজি, বাংলা, মাদ্রাসা, ক্যাডেট-এই চতুর্মুখী শিক্ষা প্রদানের শ্রেণি বৈষম্যজনিত টানাটানিতে ‘শিক্ষা ও ভাষা’ উভয় প্রপঞ্চেরই প্রাণ ওষ্ঠাগত আজ।

প্রায় শতবর্ষ আগে অবরোধের ভেতর থেকে স্বচেষ্টায় স্বশিক্ষিত রোকেয়া উচ্চারণ করেছিলেন বাঙালির জাতিগত মোনোদর্শন ও মৌলিক চারিত্র্যসমূহ। নারীর অবরোধ-শিক্ষা-ক্ষমতায়ন ছাড়াও তিনি বাঙালির জাতি-রাষ্ট্র বিষয়ক অবকাঠামো নিয়েও ভেবেছেন। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সমাজ সংস্কারকরূপে সাদৃশ্য থাকলেও রোকেয়াকে তাই সমাজ চিন্তকরূপে এগিয়ে রাখা যায়।

জীবনের শেষ পর্যায়ে গিয়ে জাতি সম্পর্কে দুজনার মনোভাবই সবিশেষ হতাশার দিকে ধাবিত হয়। একদিকে বিদ্যাসাগরের আক্ষেপ, ‘আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ জানিলে আমি কখনোই বিধবা বিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না।’

অন্যদিকে রোকেয়ার খেদোক্তি: ‘আমি কারসিয়ং ও মধুপুর বেড়াইতে গিয়া সুন্দর সুদর্শন পাথর কুড়াইছি; উড়িষ্যা ও মাদ্রাজে সাগর তীরে বেড়াইতে গিয়া বিচিত্র বর্ণের বিবিধ আকারের ঝিনুক কুড়াইয়া আনিয়াছি। আর জীবনের ২৫ বৎসর ধরিয়া সমাজসেবা করিয়া কাঠমোল্লাদের অভিসম্পাত কুড়াইয়াছি।’

অর্থাৎ বড় মাপের মানুষেরাও আমাদের মতোই দেশ জাতি নিয়ে ‘আমাদের দিয়ে কিছুই হবেনা’ ধরনের শোক প্রকাশ করেছেন। পার্থক্য এটুকুই যে, মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্তও তারা নীরবে নিভৃতে অধঃপতিত জাতির উন্নয়নেই কাজ করে গেছেন।

কে বলবে এমন প্রজ্ঞাময় উক্তি শতবর্ষ পূর্বের অবরুদ্ধ এক নারীর- ‘দেশের দুর্ভিক্ষ নিবারণের জন্য পরিশ্রম করা অপেক্ষা আমেরিকার নিকট ভিক্ষা গ্রহণ সহজ।’ আমরা সেই সহজ কাজটিই করে যাচ্ছি আজো। বিদেশি বাণিজ্য অবাধে চলছে নামে-বেনামে। মেকলে- ক্লাইভ-হলওয়েলদের প্রেতাত্মাগণ সুললিত বিজ্ঞাপনে শিশুভোলানো ছড়া-গান শুনিয়ে আগের মত শুধু ‘বাদামি মুখ, সাদা মন’ বানিয়ে অব্যাহতি দিচ্ছে না। সেই দেশি মুখ, বিদেশি মুখোশ পরিহিতদের দিয়েই প্লট আকারে বিক্রি হচ্ছে শিক্ষা, পাচার হয়ে যাচ্ছে তরুণের মেধা, যুবকের শ্রম, নারীশরীর, শিশুর কিডনি, উজার হচ্ছে জঙ্গলের কাঠ-গাছ, বাঘ-হরিণ। মাটির নিচে ইজারা বসছে গ্যাস-তেল-কয়লাখনির।

বিষাক্ত খাবারে জন্ম নিচ্ছে প্রতিবন্ধী শিশু। আমরা বিষ প্রদান প্রতিরোধ না করে এনজিও বিদেশি সংস্থাগুলোর সহায়তায় প্রতিবন্ধীদের জন্য নানা কর্মসূচি পালন করছি। নিঃসংশয়ভাবে সংবেদনশীল এই বিষয়টিকে নিয়ে বাণিজ্য ইজারা নেবার দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা ঘটে চলেছে।

আমরা এইসব কর্মযজ্ঞের ঘূর্ণ্যমান চক্রে অতীব নিম্নস্তরের মধ্যস্বত্ত্বভোগী শ্রেণি। ট্রিলিয়ন, বিলিয়ন পার হয়ে এসে লুটের বখরার সর্বনিম্ন তলানিতে আমরা সন্তুষ্ট থাকি আর আজীবনের জীবন বীমা পরিকল্পনার ছক তৈরি করে ফেলি।

৬.
মিডিয়ার কল্যাণে আজকাল বিতর্কিত হওয়া মানেই খ্যাতিবৃদ্ধি। রবীন্দ্রনাথের সৌভাগ্য যে, তিনি যখন একুশ শতকের প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যাবার কথা, তখন তাকে ঘিরে একের পর এক বিতর্কের জন্ম হচ্ছে। বিতর্ক মানেই নতুনভাবে আলোচনায় ফিরে আসা, ভিন্ন-ভিন্ন পাঠ-প্রতিক্রিয়া। কাজেই হারিয়ে যাওয়ার বদলে তিনি নতুন নতুন মাত্রায় উন্মোচিত হয়ে চলেছেন পাঠকের কাছে। তবে ঔপন্যাসিক হিসেবে তার ব্যর্থতা বিষয়ে তার সমকালীন ভক্তকুলও একমত পোষণ করতেন। যদিও ‘গোরা’ উপন্যাসটিকে আমরা দেখছি বাঙালির আত্মসমালোচনার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে।

নায়ক গোরার সদম্ভ আত্মম্ভরিতা, আর কট্টর রক্ষণশীল আচরণের সমুচিত জবাব দিয়ে দিয়েছেন লেখক উপন্যাসের শেষাংশে। প্রতীকীভাবে লেখক দেখিয়েছেন মানুষের গোত্রপ্রীতি, গোষ্ঠীবদ্ধতা কতখানি ঠুনকো আর পলকা।

‘গোরা’ উপন্যাসে জ্যামিতিক নকশায় ভিন্ন মেরুতে ভিন্নমতাবলম্বীদের দাঁড় করিয়ে দিয়ে একটা বিষয় প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, ধর্মের উদ্বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়াটাই বড় কথা নয়। যদি না সেটি আরো বড় উদ্বন্ধন রজ্জু হয়ে দাঁড়ায়।

একদিকে গোঁড়া রক্ষণশীল কৃষ্ণদয়াল বাবুদের প্রতিবন্ধী সমাজ। অন্যদিকে বেড়া ভাঙতে গিয়ে নিজেদের অন্য এক বেড়ায় বেঁধে ফেলা হারানবাবুদের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী। পৃথিবীর নিকট ইতিহাসের দিকে তাকালে সমাজতন্ত্রের পতনের কিঞ্চিৎ ছায়া প্রতিভূরূপে কি হারানবাবুকে প্রতিস্থাপিত করা যায়?

উপন্যাসে দেখা যায়, এক জোড়া তরুণ-তরুণীর (বিনয়-ললিতা) বিবাহ প্রসঙ্গে ব্রাহ্ম সমাজ, হিন্দুসমাজ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে গেলো-গেলো রব সৃষ্টি হয়। দফায় দফায় সভা-মিটিং-আলোচনায় সরগরম হয়ে ওঠে পরিবেশ। মিডিয়া তখনো ছিলো বৈ কি, শুধু প্রিন্টিং মিডিয়া হলেও। এবং দুটি পক্ষই উপনিবেশ-শাসিত রাষ্টযন্ত্রের বিকল হতে থাকা কলকব্জার ভিতর বসবাসরত, অথচ তাদের আচরণে তা মোটেই প্রতিফলিত হয় না। কেননা, বিনয়-ললিতার বিবাহপ্রসঙ্গের সমাপ্তি ঘটতে না-ঘটতেই তারা গোরার শ্রাদ্ধ, গোরা-সুচরিতা সম্পর্কের গুজব, গোরার জন্মরহস্য ইত্যাকার ইস্যুতে ব্যস্ত হয়ে যাবার অবকাশ পেতে থাকে।

এইসব ভিড়ের মানুষদের কোলাহলে ব্যতিক্রম আনন্দময়ী ও পরেশবাবু। শুভত্ববোধের প্রতীক। কিন্তু, হিন্দুসমাজভূক্ত আনন্দময়ীর উদার মনোভাব, যা-কিনা গোরার প্রতি অপত্যস্নেহজাত বলে নিঃসংশয়রূপে প্রশ্নাতীত নয়, অথবা পরেশবাবু, যিনি ব্রাহ্মসমাজেও বিচ্ছিন্ন বহিরাগতরূপে বিরাজমান এবং সবশেষে সকল ভালোত্ব নিয়ে পলায়নোদ্যত। কাজেই তাদের শুভত্ববোধের এমন অন্তর্মুখী রূপ আমাদের ইতিহাসের উত্থান-পতনের ধারায় কোনো ছায়া ফেলতে পারেনা।

সততা, পরাজয়, পলায়ন, বিচ্ছিন্নতা- সব মিলিয়ে একাকী আধুনিক মানুষের অস্তিত্ব সমাজ কাঠামোর কলকবজায় অদৃশ্যই থেকে যায়। অন্যদিকে সৎ-অসতের দ্বন্দ্বে আর দোলাচলবৃত্তিতে কম্পমান, গোষ্ঠীবদ্ধ মধ্যবিত্ত সর্বদাই আসমানে বিরাজমান দেবতাসদৃশ নেতার মঞ্চের দিকে উর্ধ্বমুখী দৃষ্টিপাতরত। তবুও, শুভত্ববোধই যদি শেষ কথা হয়ে থাকে তাহলে গোরার কট্টর রক্ষণশীলতাও ইতিবাচক হয়ে উঠতে পারে ভিন্ন-পাঠে। যেমন- তার যুক্তিভাষ্য:

‘আমি ঠাকুরকে ভক্তি করি কিনা বলতে পারিনে কিন্তু আমি আমার দেশের ভক্তিকে ভক্তি করি।’ – অর্থাৎ তার ধর্মবোধের মূল দেশপ্রেমের চেতনায় প্রোথিত। অন্যদিকে মুক্তমনা পরেশবাবুর সিদ্ধান্ত:

‘সম্প্রদায় এমন জিনিস যে, মানুষ যে মানুষ, এই সকলের চেয়ে সহজ কথাটাই সে একেবারে ভুলিয়ে দেয়। মানুষকেই সমাজের খাতিরে সংকুচিত হয়ে থাকতে হবে এ কথা কখনোই ঠিক নয়- সমাজকেই মানুষের খাতিরে নিজেকে প্রশস্ত করে তুলতে হবে।’ অর্থাৎ পরেশবাবুর সমাজবিরোধিতার মূল উদ্দেশ্য মানবতাবাদ।

বাঙালির এও এক চিরকালীন সংকট, চারপাশ জুড়ে ধর্মান্ধ কৃষ্ণদয়াল আর মতান্ধ হারানবাবুদের ভিড়। যাদের না আছে ধর্ম, না আছে দেশপ্রেম, না আছে মানবতাবাদ। দোদুল্যমান নৈতিকতা, মূল্যবোধের সংকট-সবমিলিয়ে স্ববিরোধী এই জাতীয় চরিত্র থেকে বেরোতে পারছিনা বলেই আইজুদ্দিরা অবর্ণনীয় কষ্টে আছে। আর সুবোধেরা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে, ইয়োরোপ-আমেরিকা-মধ্যপ্রাচ্য-ভারতে। না পারলে কম্পোডিয়ার জঙ্গলে লাশ পাওয়া যাচ্ছে, অথবা কাটাতাঁরে ঝুলন্ত অবস্থায়। অন্যদিকে সুবোধের পরিবর্তে নির্বোধেরা ছেয়ে ফেলছে স্বদেশের আকাশ-নদীজল-মৃত্তিকা-বনভূমি।

 

 

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook

(ভিডিও)
অন্যান্য1 week ago

আলোচনায় ‘রস’ (ভিডিও)

মাসুমা রহমান নাবিলা (Masuma Rahman Nabila)। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা4 months ago

‘আয়নাবাজি’র নায়িকা মাসুমা রহমান নাবিলার বিয়ে ২৬ এপ্রিল

‘মিথ্যে’-র একটি দৃশ্যে সৌমন বোস ও পায়েল দেব (Souman Bose and Payel Deb in Mithye)
অন্যান্য4 months ago

বৃষ্টির রাতে বয়ফ্রেন্ড মানেই রোম্যান্টিক?

Bonny Sengupta and Ritwika Sen (ঋত্বিকা ও বনি। ছবি: ইউটিউব থেকে)
টলিউড4 months ago

বনি-ঋত্বিকার নতুন ছবির গান একদিনেই দু’লক্ষ

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)
অন্যান্য4 months ago

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)

ভিডিও5 months ago

সেলফির কুফল নিয়ে একটি দেখার মতো ভারতীয় শর্টফিল্ম (ভিডিও)

ঘটনা রটনা6 months ago

ইউটিউবে ঝড় তুলেছে যে ডেন্স (ভিডিও)

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌'কথার কথা' (প্রমো)
সঙ্গীত7 months ago

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌’কথার কথা’ (প্রমো)

সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া
সঙ্গীত7 months ago

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান গাইলেন সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া

মাহিমা চৌধুরী (Mahima Chaudhry)। ছবি : ইন্টারনেট
ফিচার8 months ago

এই বলিউড নায়িকা কেন হারিয়ে গেলেন?

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম