Connect with us

গল্প

পার্সেল | সত্যজিৎ বিশ্বাস

Published

on

পার্সেল | সত্যজিৎ বিশ্বাস

বাহ! দারুণ তো !! পনেরো ডিগ্রি সেলসিয়াস!!! ঘুম ঘুম চোখে সেলফোনের স্ক্রিনে আজকের টেম্পারেচার চেক করে জয় দারুণ খুশি। নভেম্বর মাসে কানাডায় পনেরো মানে দেশের শীতকাল। গত আটটি বছর দেশের মুখ দেখেনি জয়। এই টেম্পারেচার যেন দেশের শীতকালটাই মনে করিয়ে দেয়।

হু হু করে বয়ে যাওয়া ঠান্ডার মাঝে যখন কানাডার মাটি স্পর্শ করেছিল প্লেন, খুব সম্ভবত সেটা ছিলো মে মাস। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে জয় লাগেজ টেনে বের করবে কি, নিজেই হয়ে গেল একটা জমাটবাঁধা বরফের লাগেজ। এত্তো ঠান্ডায় নিজেকেই টেনে নেয়া দায়। যে বন্ধু এয়ারপোর্টে ওকে নিতে এসেছিলো, জয়ের এই কাঁপুনি দেখে হেসে বলে, “মে মাসের এই টেম্পারেচারই নিতে পারছো না, উইন্টারে কি করবে? ইটস কানাডা মাই ফ্রেন্ড!”

হুম, কানাডায় যে সবসময় কান-ডা ঠান্ডাই থাকে সে সত্য জেনেও ভবিষ্যতের স্বপ্নে তাকে আসতে হয়েছে। অথচ ঠান্ডাটা জয়ের চিরশত্রু। একটুও ঠান্ডা নিতে পারেনা। তাও তো ভাগ্য ভালো টরেন্টোতে এসেছে। সাস্কাচুয়ান বা নিউফাউন্ডল্যান্ড কিংবা নোভাষ্কোশিয়া ওসব জায়গায় টেম্পারেচার নাকি মাইনাস চল্লিশ-এও নেমে যায়। ভাবা যায় মাইনাস চল্লিশ! ওখানের মানুষগুলো মানুষ, না জীবন্ত বরফের চাঁই!

প্রথম প্রথম পাঁচ/দশ ডিগ্রি টেম্পারেচারে বের হবার কথাই কল্পনাই করতে পারতো না জয়। আর এখন মাইনাসেও কতো সহজেই জোব্বা পেঁচিয়ে কাজে বেড়িয়ে পড়ে। এই অভ্যাসটা রপ্ত করতে বেশীদিন লাগেনি। জীবন-জীবিকা মানুষকে হ্যাঁচকা টানে রাস্তায় নামিয়ে শিখিয়ে নেয় অনেক কিছুই।

দেশে থাকতে চাকরির বাজারে ধাক্কা খেতে খেতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলো প্রতিনিয়ত। সকালে দাঁত ব্রাশ করার সময় আয়নার দিকে তাকালে সে স্পষ্ট দেখতে পেত, আয়নার ভেতরের মুখটা তার দিকে মুখ টিপে টিপে হাসতে হাসতে বলছে- শুধু নামে জয় ছাড়া জীবনে আর কোনোকিছুতে জয় আছে রে তোর?

ওই অবস্থার মধ্যে কানাডা আসার এমন একটি সুযোগ পেয়ে গেলে তাই আর অন্য কোনোদিকে তাকায়নি।

কতো স্বপ্ন নিয়েই না সাত সমুদ্র তের নদী পার হওয়া! সবাই বলতো- কানাডায় নাকি সহজে ইমিগ্র্যান্ট হওয়া যায়। ইমিগ্র্যান্ট হয়ে গেলেই মা আর ছোট ভাইটাকে নিজের কাছে নিয়ে আসবে। জীবনে অনেক কষ্ট করেছে মা। মা’র জন্য এইটুকু সুখ কিনতেই হবে।

যদিও মায়ের ইচ্ছে ছিলোনা জয়ের কানাডা যাওয়াটা। একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরি আর দুটো টিউশনি করে চলেই তো যাচ্ছে সংসার। কিন্তু মাকে নিয়ে জয় যে এক আকাশ স্বপ্ন দেখে সেই স্বপ্নে হাসি থাকে, ঝগড়া থাকে, মান-অভিমান, ভাব সবই থাকে। শুধু অভাবের কোনো স্থান নেই। জীবনে পুড়তে পুড়তে সবচে বড় উপলব্ধি যেটা হয়- অভাবের মাঝে বেঁচে থাকাকে জীবন বলে না। চড়া দামে হলেও মাকে সুখ কিনে দেবে সে।

জয় এসেছিলো ভিজিট ভিসায়, তারপর থেকে ওয়ার্কিং ভিসার জন্য যুদ্ধ। যতোটা ভেবেছিলো কানাডায় ডলার তুলনামূলক সহজেই বড় নোট হয়ে হাতে আসে, বাস্তবে মিল খুঁজে পায়না। সকালে একটা গ্রোসারীর দোকানে কামলা খাটা, তারপর বিকেলে রেষ্টুরেন্টে কিচেনে কাজ। সারাদিনে খাওয়া বলতে ওই রাতেই যা খাওয়া হয়, সেটাও ওই রেষ্টুরেন্টে। সকালে এক কাপ কফিতে চুমুক দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে যে দিনটা শুরু হয়, শেষ হয় গভীর রাতে বিধ্বস্ত শরীরে ঘরের পথে দীর্ঘশ্বাস ভরা পা ফেলতে ফেলতে। ঘরভাড়া দিয়ে, আনুষাঙ্গিক বিভিন্ন খরচের পর হাতে থাকেনা তেমন কিছুই। যেটুকু বাঁচে পাঠিয়ে দেয় মাকে। ফোনে বলে “অপেক্ষা করো ইমিগ্র্যান্ট হয়ে নেই, তোমাকে খুব তাড়াতাড়ি নিয়ে আসবো মা।”

পয়সা বাঁচাতে হলে রোজ ফোন দেয়া যায় না। সাড়ে তিন ঘণ্টা কথা বলার জন্য একটা কলিং কার্ডের দাম পাঁচ ডলার। ওরা বলে সাড়ে তিন ঘণ্টা, কিন্তু দুই ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট ক্রস হতে দেখেনি কখনো। মাকে মিথ্যে বলতে হয় “একদম সময় পাইনা, রোজ ফোন দেয়াটা সম্ভব না মা।”

জয় ছোটবেলা থেকেই মা ন্যাঁওটা ছেলে। মা ফোনে ছোটবেলার সেই মায়ের আঁচল ধরে ধরে হাঁটা ছেলেটার এক একটা ঘটনা মনে করিয়ে দিতেই মা-ছেলে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। কথা বলা শেষ করে ফোনের দিকে তাকিয়ে উদাস হয়। মাকে ছাড়া একটা দিন কাটানো যার ভাবনাতেই আসেনি সেই ছেলে এক/দুই বছর তো না, ছয়টি বছর কাটিয়ে দিলো! কতদিন মায়ের গন্ধ পাওয়া হয়না।

বন্ধুরা পরমর্শ দেয় এখানেই বিয়ে করে ইমিগ্র্যান্ট হবার। জয় এভাবে নিজেকে বিক্রি করে দিতে চায় না। তাছাড়া মায়ের অনেক স্বপ্ন, জয়ের জন্য নিজে মেয়ে পছন্দ করবে। খুব ছোটবেলাতেই বাবাকে হারানোর পর এই মা সব প্রতিকূলতায় তালি দিয়ে দিয়ে বড় করেছে তাকে, সেই মায়ের একটা ইচ্ছে কি পূর্ণ করবে না জয়?

দেশে গিয়ে যে মাকে নিয়ে আসবে তারও কোনো উপায় নেই। কতো-কতোবার দেশে যেতে মন চেয়েছে কিন্তু আইনি জটিলতায় আটকে গিয়ে আর দেশে ফেরাই হলোনা। মাঝে মাঝে মন চায় সব ফেলে দেশে চলে যেতে, কিন্তু গিয়ে হবে টা কি? এতো টাকাও জমেনি যে দেশে গিয়ে কিছু একটা করে খাবে। এখানে ইমিগ্রেন্ট হবার ব্যাপারে যে ল’ইয়ার কেসটা লড়ছে, সে শুধুই আশ্বাস দিয়েই যাচ্ছে, ‘হয়ে যাবে, হয়ে যাবে।’ আশ্বাসবাণী উপেক্ষা করে যে ল’ইয়ার বদলাবে সে ক্ষমতাও নেই। কারণ ওই একটাই- “টাকা”। প্রচুর টাকা লাগে ল’ইয়ারের পেছনে। পরিচিত বলে তাও কিছু রক্ষা। মাকে বোঝায়, “একটু অপেক্ষা করো মা, আর কিছুদিন!” অনিশ্চিত কিছুর জন্য নিজে অপেক্ষা করা আর তার সাথে মাকেও অপেক্ষা করানো ছাড়া যখন আর কোনো বিকল্প থাকে না তখন বড্ড অসহায় লাগে। নিজেকে খুব ছোট বলে মনে হয়।

গত দু’বছর ধরে মা খুব শান্ত হয়েছে। এখন আর হাজার বার জিজ্ঞাসা করে না- কিছু খেয়েছিস? তোর গলার স্বর এমন শুকনা শোনাচ্ছে কেন? তুই কবে ইমিগ্রেন্ট হবি? মাথা মোটা ল’ইয়ারটা কি আসলেই পারবে কিছু করতে?

স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মাথায় বুদ্ধিটা হঠাৎই এলো জয়ের। ছোট ভাইটাকে ফোন দিলো সাথে সাথে। যত তাড়াতাড়ি পারে যেন পার্সেলটা পাঠিয়ে দেয়।

কে জানে,কতদিন লাগে ডাকযোগে পার্সেল এসে পৌঁছাতে। প্রতিটা দিন যেন বছরের মতো যাচ্ছে। যে পার্সেলটা আসছে, সেটা নিয়ে কত কি ভাবে জয়। মনে আঁকা ক্যালেন্ডারের পাতায় আঁচড় দিয়ে দিয়ে ক্ষন গোণে।

হিসেব অনুযায়ী আজ আসবে পার্সেলটা। ঘুম থেকে উঠেই ভালো লাগায় ভরে যায় মন। কাজ থেকে ছুটি না পাওয়ায় একটু যে টেনশন নেই, তা না। যখন পোষ্টঅফিসের গাড়ি আসবে, তখন সে বাসায় থাকবে না। অথচ পার্সেলটা এসে তার অপেক্ষায় বসে থাকবে। এটা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে যায়। কি আর করা, রাতে ফিরেই মেলবক্স থেকে নিতে হবে পার্সেলটার নোটিশ। এ ধরনের পার্সেল সাধারণত ওরা মেলবক্সে রাখে না।

কাজ শেষ হতেই প্রায় দৌড়ে বাসায় ফেরে। মেলবক্সের সামনে এসে হাঁপাতে থাকে। উত্তেজনায় কেমন জানি বুক ঢিপঢিপ করতে থাকে। কিন্তু একী? ভেতরে তাকিয়ে হতাশ হয়। মেলবক্সে তো কোনো নোটিশ নেই। তার মানে আসেনি? কোনো পার্সেল এলে মেলবক্সে একটা নোটিশ তো রেখে যাওয়ার কথা। মাঝে মাঝে ওরা দু/একদিন দেরী করে। এতে টেনশনের কিছু নেই জেনেও প্রায় নির্ঘুম কাটে রাতটা।

পরেরদিন কাজ থেকে ফিরে এসে মেলবক্স খুলে দেখে নোটিশ। আগামীকাল দুপুর একটার পর পার্শ্বেল নিতে যেতে বলেছে। সাথে অবশ্যই একটা ফটো আইডি লাগবে। ওর তো বৈধ কাগজ-পত্র এখনও হয়নি। এই যে নোটিশ, সেটা এসেছে জয়ের বন্ধু প্রবালের নামে। প্রবাল নাইট ডিউটি সেরে আসবে আগামীকাল ভোরে। ওকে বলতে হবে দুপুর একটায় পোষ্ট অফিস যেতে। প্রবাল খুব ভালো বন্ধু।যে কোনো সমস্যায় সবার আগে ওইই ছুটে আসে। প্রিয় বন্ধুর কাছে এতটুকু দাবীতো করাই যায়। তাছাড়া পার্সেলটা পাবার জন্য আর একটা মূহূর্ত দেরী সহ্য হচ্ছে না।

অন্য সব দিনের মতোই আরেকটা সকাল। এলার্ম ক্লকের শব্দে ঘুম ভেঙে যাবার পর জয় জানালার কাঁচে চোখ রাখে। দূরের ল্যাম্পপোস্টে ওটা কি বসা? কাক না শালিক? আরে, আরে… পাশ থেকে কিছু একটা নড়ে ওঠায় বোঝা গেল- ওখানে একটা না দুটো।সাথে সাথে ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমা এক করে ঠোঁট ছুঁইয়ে চুমু খেয়ে নিজের মনে নিজেই হেসে ফেলল। দুটো শালিক মনে করে চুমু খাবার সংস্কার তাকে টরেন্টো শহরও আটকে রাখতে পারেনি।

অনেক বলে কয়ে কাজ থেকে ছুটি পেয়েছে আজ। বেশ খানিকক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি করে বের হয় লেকের উদ্দেশে। এই লেকের পাড়টায় বসলে কেন জানি মনে হয় সে আছে দেশের মধ্যেই। মন খুব খারাপ থাকলে এখানে বসে স্মৃতির পাতা উল্টায়। লেকের জলের সাথে কথা বলে। হঠাৎ বেজে ওঠে সেলফোন। সবুজ বোতামে আঙ্গুল ছোঁয়াতেই শোনে প্রবালের ঝাড়ি- কই তুই? হাতে একদম সময় নেই। পার্সেলটা ডাইনিং টেবিলে রেখে গেলাম।

ছুটতে ছুটতে বাসায় ফেরে জয়। ডাইনিং টেবিলে রাখা পার্সেলটার দিকে অনেকক্ষন ধরে তাকিয়ে থাকে। কাঁপা কাঁপা হাতে একটু একটু করে খোলে প্যাকেটটা। ভেতর থেকে বের হয় একটা পুরোনো শাড়ি। যে শাড়িটা দুবছর ধরে কেউ পড়েনা। যে শাড়িটার ভাঁজে ভাঁজে মায়ের গন্ধ। জয় শাড়িটা জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো চিৎকার করে বলে- মা, মাগো…

 

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook

(ভিডিও)
অন্যান্য1 week ago

আলোচনায় ‘রস’ (ভিডিও)

মাসুমা রহমান নাবিলা (Masuma Rahman Nabila)। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা4 months ago

‘আয়নাবাজি’র নায়িকা মাসুমা রহমান নাবিলার বিয়ে ২৬ এপ্রিল

‘মিথ্যে’-র একটি দৃশ্যে সৌমন বোস ও পায়েল দেব (Souman Bose and Payel Deb in Mithye)
অন্যান্য4 months ago

বৃষ্টির রাতে বয়ফ্রেন্ড মানেই রোম্যান্টিক?

Bonny Sengupta and Ritwika Sen (ঋত্বিকা ও বনি। ছবি: ইউটিউব থেকে)
টলিউড4 months ago

বনি-ঋত্বিকার নতুন ছবির গান একদিনেই দু’লক্ষ

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)
অন্যান্য4 months ago

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)

ভিডিও5 months ago

সেলফির কুফল নিয়ে একটি দেখার মতো ভারতীয় শর্টফিল্ম (ভিডিও)

ঘটনা রটনা6 months ago

ইউটিউবে ঝড় তুলেছে যে ডেন্স (ভিডিও)

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌'কথার কথা' (প্রমো)
সঙ্গীত7 months ago

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌’কথার কথা’ (প্রমো)

সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া
সঙ্গীত7 months ago

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান গাইলেন সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া

মাহিমা চৌধুরী (Mahima Chaudhry)। ছবি : ইন্টারনেট
ফিচার8 months ago

এই বলিউড নায়িকা কেন হারিয়ে গেলেন?

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম