Connect with us

গল্প

রসায়ন শিক্ষক ‍| তারিক সামিন

Published

on

রসায়ন শিক্ষক ‍| তারিক সামিন
রসায়ন শিক্ষক ‍| তারিক সামিন


তমার বয়স ২০। উচ্চতায় কিছুটা খাটো, গায়ের রং ফর্সা, মাঝারী স্বাস্থ্য, চোখা নাক, বড় বড় চোখে আর গোল হৃষ্টপুষ্ট মুখে একটা আকর্ষনীয় আর সহজ সরল অভিব্যক্তি।
তমার জীবনের কোন ল্য নাই। তার মা-খালা, দাদী-নানী সবাই শৈশব থেকে কৈশর পর্যন্ত একটা কথাই বলে আসছে। তুমি একটা মেয়ে, মেয়েদের কাজ ঘর-সংসার করা।
মেঝ খালা এসেছেন কিছুক্ষণ হল, তমার পাশে সোফায় বসলো।

  • হ্যাঁ’রে তমা তোর কেমন বর পছন্দ ? তমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো মেঝ খালা।
  • ছেলেকে অবশ্যই দেখতে হ্যান্ডসাম হতে হবে। চেহারা সুন্দর হতে হবে।
  • আর!
  • স্বভাব চরিত্র ভাল হতে হবে।
  • আর!
  • টাকা পয়সা থাকতে হবে। যাতে আমাকে নিয়ে দেশে-বিদেশে ঘুরতে পারে, শপিং করতে পারে। খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল তমাকে।
  • আচ্ছা, হাসছিলেন মেঝ খালা।
    মেঝ খালা চলে গেলে, তমা টেলিভিশনে হিন্দি সিরিয়াল দেখতে বসলো।

 


মোহাম্মদ হাবীবুল বাসারের, বয়স ৩৫। মাঝারী উচ্চতা, শ্যাম বর্ন। মাথায় অর্ধেকের বেশী জুড়ে টাক। অতিরিক্ত সিগারেট খেতে খেতে ঠোঁটের রং কালো বর্ণ ধারণ করেছে। পেশায় সরকারি কলেজের শিক্ষক। ছাত্র হিসাবে অসাধারণ ভালো। স্কুল-কলেজ জীবনে কাসে সে কখনো দ্বিতীয় হয়নি। অনার্স, মাস্টার্সে ও রেজাল্ট ভাল। বেতন এবং প্রাইভেট টিউশনি মিলিয়ে ভালই আয় তার।
ইয়াসমিন কলেজে তার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকা। একটু ঠোঁট কাটা স্বভাবের। যা বলবে সরাসরি। তবে মনটা খুব ভালো। ইয়াসমিন জিজ্ঞাসা করলো-
– বাহার ভাই ক্যামন মেয়ে দেখবো ?
– আপা দেখতে সুন্দর হতে হবে।
– তা কেমন সুন্দরী! ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করে ইয়াসমিন।
– ফর্সা, স্বাস্থ্য ভাল, বয়স কম।
– কচি! হেসে ফেললো ইয়াসমিন
– ঢাকায় নিজস্ব বাড়ি আছে। এমন ফ্যামিলি হলে বেশ ভাল। সিরিয়াস হয়ে বললো বাহার।
– উচ্চ শিক্ষিত, বুদ্ধিমতী, চাকরীজীবি মেয়েদের কি হবে বাহার ভাই ?
– তাদের তো বিয়ে হয়ে যায় আগেই।
– তাই, আমার কী বিয়ে হয়ে গেছে।
– আপনার তো বাবুল ভাই এর সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।
– হুম! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, আমাদের ছাত্রীদের মধ্যেই তো অনেকে আছে দেখবো।
– না, আপা। আমাদের কলেজের বাইরের মেয়ে হতে হবে।

 


তমার মত স্ত্রী পাবে আশা করেনি বাহার । ছোট-খাটো মেয়েটির লাজুক চাহনি, মুখের কমনীয়তা, সহজ সরল অভিব্যক্তি। প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে গেল বাহার।
তমার েেত্র অবশ্য ঘটলো উল্টোটা। পাত্রের চেহারা আকর্ষনীয় নয়। তারপর আবার এখানেই থাকবে, ঘর-জামাইয়ের মত। শুনে কান্না-কাটি শুরু করে দিল তমা। তবে মায়ের অমতে যাবার মত সাহস তার কোন কালেই ছিল না।
সবার পীড়াপিড়িতে অবশেষে তমার বিয়ে হল। ছেলে পরে আত্মীয়-স্বজন কেউ ঢাকাতে থাকেনা। তাছাড়া দরিদ্র কৃষকের ছেলে, পাছে এই পরিচয় বের হয়ে যায়। তাই পাত্রের বাবা-মা ও তার কলেজের ক’জন শিক্ষক ছাড়া আর কেউ যাতে নিমন্ত্রিত হতে না পারে। সে ব্যাপারে বাহারকে পুরোপুরি সতর্ক করে দিল তমার বাবা-মা।
বিয়ের আয়োজন হল তমাদের বাড়ীর ছাদে। নিমন্ত্রিত অতিথি দুই শতাধিক তার মাঝে পাত্র পরে আটজন মাত্র।
বাহারের পরনে সাদা পাঞ্জাবি তাতে লাল-নীল কাজ করা। কালো মোটা ফ্রেমের চশমা। নাগরা জুতা। ভাড়া করা শেরোয়ানী আর পাগড়ী।
আসার সময় মাঝারী এক স্যুটকেসে, কনের বিয়ের শাড়ি, জামা-কাপড় আর প্রসাধনী আর বড় এক বস্তায় নিজের বই-পত্র, জামা-কাপড়, জুতো-স্যান্ডেল সব ভরে নিয়ে এসেছে বাহার।

তমার পরনে লাল বেনারশী শাড়ি, তাতে সোনালী কাজ করা। শরীর জুড়ে স্বর্ণের গহনা। উচুঁ হিলের সোনালী কাজ করা জুতো। মাথায় টিকলী আর গলায় হারটা বিয়ে উপলে বানানো হলেও; হাতের বালা, চুড়ি এসব পুরনো, তমার মায়ের গহনা। অপূর্ব সুন্দর লাগছিল তমাকে।
তবুও সবকিছু ছাপিয়ে বেদনার চিহ্ন ছিল নববধুর মুখে। বড় ঘোমটার নিচে অব্যক্ত সেই বেদনা কেউ টের পেল, কেউ পেলনা।
কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানোর প্রস্তুতি নিয়ে, দেনমোহর পঁচিশ ল টাকা ও দশ ভরি স্বর্ণের ব্যাপারে বাহারের পিতাকে জিজ্ঞাসা করলে। বাহরের পিতা মূর্ছা যাবার মত অবস্থা!
ঘটক বললো- আহা এসব নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না। ছেলের সাথে আগেই কথা বলা আছে।
– বাহার! বলে। কপালের ঘাম মুছলেন পিতা।
-আহ! এই যে পাঁচ তলা বাড়ি এখানে ফ্যাট পাবে আপনার ছেলে। হাসি মুখে কথা বলছিল ঘটক ইব্রাহিম খলিলউল্লাহ।

 


প্রবল বর্ষণের মধ্যেও মধ্যরাত পর্যন্ত আহার, গান-বাজনা চললো। সাড়ে বারোটায় বর; গৃহের দরজা আটিলেন। যে ঘরটিতে বাসর সাজানো হয়েছে, সেটি তমার শোবার ঘর। দেয়াল নতুন রং করা। যে বিছানায় ফুল শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে তার পুরোনো গদিটি উঁচু-নিচু, নতুন চাদরের নীচে পুরোনো তোষক উকি মারছে।
বাহার কনের সৌন্দর্য আর নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিল। কখনো নিঃশ্বাস ঘন ঘন; আর কখনো নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যাচ্ছিল সে।
ঘোমটা মাথা নিচু করে অনেকণ ধরে কাঁদছিল তমা। হাঠাৎ তমার একটি হাত নিজের হাতে নিয়ে শিক্ষক সুলভ আদেশে বাহার বললো- কান্না করো না। নিজের হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে, তমা খেয়াল করলো, গ্রাম্য কৃষকের ছেলের কঠিন শক্তিশালী থাবার মধ্যে বাধা পড়ছে তার নরম দুর্বল হাতটি। অনেকটা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে সমর্পন করলো তমা।
সেই রাত বাহারের জীবনে নতুন প্রেমের জোয়ার সূচনা করলো। বাহার পণ করলো, এখন থেকে বেঁচে থাকবে শুধু তমার জন্য।
পরদিন বাহারের বাবা-মা ছেলের নতুন জীবন থেকে অশ্রুসজল বিদায় নিলেন। কেউ তাদের এ বাড়িতে পুনরায় আসতে অনুরোধ করলো না।

দিন দশেক বাদে বাহার জানতে পারলো এই বাড়ীল মালিক তমার বড় খালু। তাদের অবর্তমানে তমার পিতা দেখাশুনা করেন। ভাড়া থাকেন।
– আব্বা এই বাড়ির মালিক, নাকি বড় খালু?, সঙ্কোচে জিজ্ঞাসা করলো বাহার।
– হ্যাঁ, তো কি হইছে। রাগত্ব স্বরে বললো তমার বাবা।
– না, ঘটক বলছিল আপনাদের। মাথা নিচু করে বললো বাহার।
বাহারের শাশুড়ি তমা’র মা কট কট রেগে বললো। – তুমি তো একটা ছোট লোকের ছেলে!
অবাক হয়ে শশুর-শাশুড়ির দিকে তাকালো বাহর।
– দেন মোহরের টাকা পরিশোধ করতে পারছো না। আবার কে কিসের মালিক তার খোজ খবর নিচ্ছো। কটাক্ষ করে বললো তমার মা।

 


তমার প্রতি গভীর ভালবাসায় আচ্ছন্ন বাহার। ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে, সকালে কলেজে যায়। বিকালে ফিরে। সন্ধ্যায় টিউশনি করাতে চলে যায়। আবার রাতে ফিরে।
কিছুদিন পর তমাদের বাসার নীচ তলায় ব্যাচে ছাত্র-ছাত্রী পড়াতে আরম্ভ করলো বাহার। অল্পদিনে অনেক ছাত্রছাত্রী হয়ে গেল। এই প্রথম তমা উপলব্ধি করলো স্বামীর পতি একটু ল্য রাখা দরকার। অনেক সুন্দরী ছাত্রীদের আসা-যাওয়া তাদের এখানে। ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই সুদর্শন।
রুমের মধ্যে কিছু খালি চেয়ার। একটা চেয়ারে বসে খাতা দেখছিল বাহার । হাতে জলন্ত সিগারেট।
তমা সাধারণত সেলোয়ার কামিজই বেশী পরে। আজ সে শাড়ি পরেছে। কালো জামদানী, সুবজ হলুদ আর লাল চারকোনা ছোট ছোট কাজ করা। সুন্দর লাগছে ওকে।
ভেতরে ঢুকে দুই হাত আড়াআড়ি রেখে তমা বললো। আর কতন! দুপুরের ভাত কি রাতে খাবে ?
বাহারের চোখ- মুখ, শরীরে কান্তি। সত্যিই সন্ধ্যা হতে চললো, এখনো খাবার খায়নি সে।

চশমাটা ডাইনিং টেবিলে রেখে বাথরুমে গেল বাহার। বেসিনে হাত ধুয়ে, পানির ঝাপটা দিল চোখে-মুখে। ক্ষুধায় নাড়ীভূড়ি জ্বলছিল তখন।
তমার রান্না দারুন স্বাদ। ফ্যানের বাতাসে ভাতগুলো কিছুটা শক্ত আর করকরা হয়ে গেছে । মুরগীর মাংস, পটল ভাজা, পুই শাক, চিংড়ি মাছ আর ডাল। পেট পুরে খেল বাহার।
ইদানিং সিগারেট খাওয়া বেড়ে গেছে বাহারের। একটার পর একটা চলতে থাকে। সোফায় বাহারের পাশে বসে তমা বললো, ‘আমার আর ভাল লাগে না। আমার বান্ধবীদের সবার নিজের ফ্যাট, সুন্দর সাজানো, কেউ কেউ গাড়ি কিনছে। আর আমি মায়ের বাসায় থাকি।’
একটু খুশঁ-খুশঁ করে কাশি হচ্ছিল বাহারের। তমার দিকে তাকিয়ে বললো,
– হবে গো হবে, তোমারও সবই হবে। বলে তমাকে জড়িয়ে ধরলো সে। কিন্তু প্রচন্ড কাশি বাধ সাধলো প্রনয়ে।

 


ওদের বিয়ের এক বছর হল। তমার পেটে বাচ্চা, রান্না-বান্না তেমন একটা করে না সে। নতুন ফাট, ফ্রিজ, টেলিভিশন, সোফা সবই কিস্তিতে কিনেছে বাহার। প্রতি মাসের প্রথমেই ব্যাংক লোনের কিস্তি শোধ করতে হয়।
বাহার ভাই নতুন ফ্যাটে কেমন লাগছে? একদিন জিজ্ঞাসা করলো ওর সহকর্মী ইয়াসমিন।
– ব্যাংকের লোনের কথা মনেহলে ঘুম আসে না আপা। বিষন্ন উত্তর দিল বাহার।

 


হঠাৎ শিক্ষকদের কমন রুমে বুকে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করছিল বাহার।
‘আনিস ভাই’, বলেই জ্ঞান হারাল সে।
ছাত্র-শিক্ষকেরা ধরাধরি করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেল তাকে।

 


তমার ছেলেটার জন্ম হল মার্চে। ভারী সুন্দর ফুটফুটে হয়েছে বাচ্চাটা। ফ্যাটের কিস্তির টাকা, স্ত্রীর ডেলিভারির খরচ; এসব করতে গিয়ে নিজের হার্টের চিকিৎসাটা দেরী করছিল বাহার।
বাহার যেদিন মরে গেল। তার আগের রাতে খুব কাঁদছিল ওর নবজাতক ছেলেটি।

Advertisement বিনোদনসহ যেকোনো বিষয় নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও- rupalialo24x7@gmail.com
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রোদেলা জান্নাত (Rodela Jannat)। ছবি : ফেসবুক
ঢালিউড3 weeks ago

শাকিব খানের নতুন নায়িকা রোদেলা জান্নাত, কে এই রোদেলা : অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

রঙ্গন হৃদ্য (Rangan riddo)। ছবি : সংগৃহীত
অন্যান্য3 weeks ago

ভাইরাল রঙ্গন হৃদ্যকে নিয়ে এবার সমালোচনার ঝড়

পূজা চেরি। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড4 weeks ago

শাকিব খানেও আপত্তি নেই পূজা চেরির

শাকিব খানকে পেয়ে যা বললেন নতুন নায়িকা রোদেলা জান্নাত
ঢালিউড3 weeks ago

শাকিব খানকে পেয়ে যা বললেন নতুন নায়িকা রোদেলা জান্নাত

আয়েশা আহমেদ
অন্যান্য2 weeks ago

আয়েশা আহমেদের আবারও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় সাফল্য

শাকিব খান ও রোদেলা জান্নাত। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা3 weeks ago

বুবলীর পর এবার সংবাদ পাঠিকা রোদেলা জান্নাতকে নায়িকা বানাচ্ছেন শাকিব খান

পায়েল চক্রবর্তী
টলিউড3 weeks ago

টালিউড অভিনেত্রী পায়েল চক্রবর্তীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

ঢালিউড3 weeks ago

এক হচ্ছেন শাকিব খান-নুসরাত ফারিয়া

শিনা চৌহান
অন্যান্য4 weeks ago

শিনা এখন ঢাকায়

অঞ্জু ঘোষ। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড3 weeks ago

যে কারণে অবশেষে ঢাকায় ফিরলেন চিত্রনায়িকা অঞ্জু ঘোষ

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
নির্বাহী সম্পাদক : এ বাকের
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম