Connect with us

মতামত

প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড়ের স্মৃতি ।। সুধাংশু শেখর বিশ্বাস

Published

on

ঘৃণিঝড়

 প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড়ের স্মৃতি ।। সুধাংশু শেখর বিশ্বাস

(আজ ১২ই নভেম্বর। ১৯৭০ সালের এই দিনে প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড় হারিকেন এর রূপ নিয়ে আঘাত হেনেছিল বাংলাদেশের উপকূলে। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষ। প্রাণ হারিয়েছিল চার লাখের উপরে। মতান্তরে দশ লাখ। বিশ্বের ইতিহাসে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগে ‌একসাথে এত মানুষের প্রাণহানির এটাই বোধহয় রেকর্ড। সেই মৃতদের স্মরণে এই রচনা)

হুদা স্যারের বদলি

১৯৭০ সাল।
পড়ি ভোলা গভর্ণমেন্ট হাই স্কুলে। সংক্ষেপে বলি ‘গভট’ স্কুল। ভোলা মহকুমার মধ্যে সেরা স্কুল বলে গর্বে আমাদের মাটিতে পা পড়ে না।

বৃটিশ আমলের স্থাপনা। লাল রঙের লম্বা দোতলা বিল্ডিং। স্থাপত্যের দৃষ্টিনন্দন নিদর্শণ। সামনে দিয়ে কলকল করে বয়ে যাচ্ছে খাল। সেই খালে সকাল-বিকাল জোয়ার-ভাঁটা হয়। খালের ওপারে ভোলার মূল বাজার।

স্কুলের ডাইনে বিশাল খেলার মাঠ, বাঁয়ে খোলা জায়গা। তার প্রান্ত ঘেঁষে স্কুল হোস্টেল, তার পেছনে নালা। নালার ওপারে সারি সারি টিনের বাড়ি। আমাদের স্যারেরা থাকেন সেইসব বাসায়।

স্কুল ভবনের পেছনে চমৎকার বড় একটা পুকুর। ঝকঝকে কাজল কালো তার জল। পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে বসে বন্ধুরা মিলে আড্ডা মারি। বিকালে খেলা শেষে ঝাঁপ দিই পুকুরে, সাঁতার কাটি এপার-ওপার।

স্কুলের আইন-কানুন ভীষণ কড়া। তারচেয়েও কঠিন আমাদের মনিরুল হুদা স্যার। ভীষণ বদরাগি আর মারমূখী। বেতপেটা করার জন্য সদা হাত নিশপিশ করে তাঁর। শুধু বেত নয়। সুযোগ পেলেই নিত্য নতুন অভিনব সব শাস্তি দেন। ভয়ে-আতঙ্কে অস্থির থাকি আমরা।

স্যারের চোখেমুখে সারাক্ষণ লেপটে থাকে রাজ্যের বিরক্তি। আমাদেরকে দেখলেই ভ্রু কুঁচকে তাকান। যেন কোন নরকের কীট। পারতপক্ষে তাই চেষ্টা করি স্যারকে এড়িয়ে চলতে।

আমাদের বন্ধুদের গ্রুপ স্কুলে ভাল ছাত্র হিসেবে পরিচিত। পড়াশুনা, খেলাধূলা, বিতর্ক, সংস্কৃতি চর্চা সবকিছুর সাথে আছে আমাদের সম্পৃক্ততা। মনিরুল হুদা স্যারের ক্রাইটেরিয়া অনুযায়ী, মর্কট দুষ্টুর দলে আমরা পড়ি না। তারপরও তটস্থ থাকি। কারণ, মারার জন্য হুদা স্যারের অজুহাতের অভাব হয় না। মাত্র কয়েকদিন আগেই অকারণে বেদম পিটিয়েছেন আমাকে। সেই স্মৃতি দগদগে ঘা হয়ে জ্বালা ধরায় মনে।

ক্লাসের পড়া, হোমওয়ার্ক সব ব্যাপারে এগিয়ে থাকি আমি। কিন্তু, কি কারণে যেন হুদা স্যারের হোমওয়ার্ক করা হয় নি সেদিন। স্যার মনে হয় খোশ মেজাজেই ছিলেন। আমার মতো ব্যর্থ যারা, তাদেরকে নাম ধরে একে একে ডাকছেন স্যার। হোমওয়ার্ক না আনার কারণ জিজ্ঞেস করছেন। উত্তর শুনে হাতের উপর একটা করে বেতের বাড়ি দিয়েই ছেড়ে দিচ্ছেন। আমার ডাক পড়ল।
হোমওয়ার্ক করিস নি কেন? স্যার জিজ্ঞেস করেন।
উত্তর না দিয়ে লম্বা করে হাত পেতে দিই। একটা তো মাত্র বেতের বাড়ি। খামাকা আর কথা বাড়িয়ে লাভ কি!
হাত পাততে বলেছি তোকে? প্রশ্ন করেন স্যার।
না…ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে অস্ফুটস্বরে উত্তর দিই আমি।
তাহলে পাতলি কেন? কঠিন চোখে জানতে চান তিনি। কি উত্তর দেব, ভেবে পাই না।
এত সাহস! ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে স্যারের মুখ।

 

কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয়ে যায়। বৃষ্টির মতো চলতে থাকে বেত। গায়ে, পিঠে, হাতে সর্বত্র। বেদম প্রহারে জর্জরিত আমি। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি স্যারের দিকে। অবাক সব বন্ধুরাও।

সেই রাগ জমে আছে মনের আকাশে ঘনকালো মেঘের মতো। বন্ধুরা মিলে তাই শাপ-শাপান্ত করি আমরা মনিরুল হুদা স্যারকে। মনে প্রাণে চাই, অচিরেই স্যার বদলি হয়ে চলে যাক অন্য কোথাও।

সেদিন ১২ই নভেম্বর।

স্কুল বন্ধ। ক্রিকেট খেলতে লেগে গেলাম বন্ধুরা মিলে স্কুলের মাঠে। সকাল থেকেই থমথমে চারদিক। কালো মেঘের ঘনঘটা আকাশে। তাতে খেলার উৎসাহে ভাঁটা পড়ে না আমাদের। দুপুরের দিকে শুরু হোল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। খেলায় ক্ষান্ত দিয়ে বৃষ্টি মাথায় ছুটলাম সবাই বাসার দিকে।

বিকাল নাগাদ বৃষ্টির বেগ বাড়ল। সাথে বাতাসের গতি। রাতের আঁধার চিড়ে পাক খেয়ে দমকা হাওয়া ঘুর্ণিচক্রের মতো বয়ে যেতে লাগল সোঁ সোঁ করে।

মনে হতে লাগলো, ঘরবাড়ি শুদ্ধ উড়িয়ে নিয়ে যাবে আমাদের। মড়মড় শব্দে উপড়ে পড়ল উঠোনের বরই গাছ। উড়ে গেল রান্নাঘরের চাল। ভেঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল কবুতরের ঘর। বাবার সাথে আমরাও বৃষ্টি আর বাতাসের মধ্যে উঠোনে নেমে পড়ি। তীরের ফলার মতো বৃষ্টির ছাঁট গায়ে বিঁধতে লাগলো। বরই ডালপাতার ফাঁকে আশ্রয় নেয়া কবুতরগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে আমরা ঘরে নিয়ে এলাম।

রেডিওতে ঘোষণা হল ১০ নং মহা বিপদ সংকেত। অজানিত ভয় আর আতঙ্কে কাঁপতে থাকি আমরা। কিন্তু সেই বিপদ সংকেত যে এমন মহাপ্রলয়ের রূপ নেবে তা স্বপ্নেও ভাবি নি।

বাতাসের বেগ কমে আসে। ভেসে আসে চারদিক থেকে আজান, উলুধ্বনি আর সাইরেনের শব্দ। আতঙ্ক বেড়ে যায় আরো।
কি ব্যাপার!
সমুদ্রের লোনা জল ঢুকে পড়েছে ভোলা শহরে।

 

দেখতে দেখতে আমাদের উঠোন জলে ভরে যায়। জল বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে আমাদের বারান্দা। বারান্দা অতিক্রম করে ঘরের ভিতর।
থৈ থৈ ঘোলা জলে ভাসতে থাকে স্যান্ডেল, ব্যাগ, তরকারি, কাঠের টুকরা। চৌকির উপরে উঠে দাঁড়িয়ে থাকি আমরা।

আশ্রয়ের খোঁজে শহরের মানুষ ছোটাছুটি করছে। হৈ চৈ, চিৎকার, চেঁচামেচি। গোটা শহর জলের নীচে। মাথা উঁচু করে খালের উপরে দাঁড়িয়ে আছে শুধু গোটা তিনেক ব্রীজ।

ভোলায় প্রায় সবই কাঠের বাড়ি। পাকা বিল্ডিং বলতে সাধনা ঔষধালয় আর হাবিব ব্যাংক। ভয়ে বুক শুকিয়ে যায় আমাদের। জল যদি আরো বাড়ে, যদি সাঁতার জল হয়ে যায় তখন কি হবে? কোথায় পাব আশ্রয়?

বাইরে ঘোর অমানিশা। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকায়।

 

ভোরের আলো ফুটলো অবশেষে। বৃষ্টি থেমে গেছে, বাতাস কমেছে। শান্ত প্রকৃতি। রাস্তায় তখন মাছেদের ছুটোছুটি। আকাশে হেলিকপ্টারের চক্কর। ডুবন্ত ভাঙ্গা টিনের কানায় পা কাটছে মানুষের। বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন।
কি নারকীয় কান্ড ঘটে গেছে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় তখনও জানি না আমরা।

চারদিক থেকে খবর আসতে থাকে, হারিকেনের রূপ নিয়ে সমুদ্র উপকূলে আঘাত হেনেছে প্রলংকরী ঘুর্নিঝড়। তালগাছ সমান উঁচু সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস তছনছ করে দিয়ে গেছে ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় এলাকা। স্রোতের তোড়ে ভেসে গেছে লক্ষ মানুষ, নারী-পুরুষ। মায়ের কোল থেকে সন্তান, স্বামীর বন্ধন থেকে স্ত্রী, বোনের হাত থেকে ভাই…

চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুধু লাশ আর লাশ। ভেসে আছে মানুষ, গরু, মহিষ, শিয়াল, কুকুরের মৃতদেহ এক কাতারে। মৃতের সংখ্যা চার লাখ ছাড়িয়ে গেছে। কেউ কেউ বলছেন দশ লাখের কম নয়।

বিশ্বের ইতিহাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগে একসাথে এত মানুষ মারা যাবার রেকর্ড বোধহয় এটাই।

ভোলা শহরের খালে ভাসে হাজার হাজার লাশ। ভেসে বেড়ায় বুকের মধ্যে সন্তান আঁকড়ে ধরে থাকা মৃত মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, মানুষ, পশুপাখি।

জল কমে গেছে। উঁচু জায়গাগুলো ডাঙ্গা হয়েছে। মৃতদেহ সেখানেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে। পচাগলা লাশের দুগর্ন্ধে নারকীয় পরিবেশ তখন সমগ্র ভোলা জুড়ে। গ্রাম-গঞ্জ উজার হয়ে গেছে।

নানারকম গল্প ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে। একটা বাচ্চা নোয়াখালী থেকে ভেসে মেঘনা পাড়ি দিয়ে ভোলায় চলে এসেছে। তাকে উদ্ধার করে এনেছে রিলিফ কর্মীরা। তালগাছের সাথে বিশাল সাপ প্যাঁচ দিয়ে আটকে রেখেছিল এক মহিলাকে। তাতেই বেঁচে গেছেন তিনি। এরকম অলৌকিক আরও কত কাহিনী। শুরু হয়ে গেল ডায়েরিয়া, রিলিফ…

আমার বাবা তখন ভোলা খাদ্যগুদামের ওসিএলএসডি। স্কুল কলেজ সব বন্ধ করে ত্রাণশিবির খোলা হয়েছে। মহসিন স্যারের নেতৃত্বে রিলিফ ওয়ার্ক করছি আমরা। গোডাউন খুলে দেয়া হয়েছে।

নৌকায় করে চাল, ডাল, আটা, চিড়া নিয়ে আমরা দূর্গত এলাকায় ঘুরি। মনপুরাতে রিলিফ দেবার মতো একজন মানুষও খুঁজে পাওয়া গেল না।

ভোলার অধিকাংশ এলাকা জলের নীচে। ডাঙ্গা পেলে সেখানেই বড় গর্ত খুঁড়ে লাশ চাপা দেয়া হচ্ছে। তারই পাশে উনুন কেটে বিশাল বিশাল হাঁড়িতে দিনরাত খিচুড়ি রান্না চলছে।

বঙ্গবন্ধু এসেছেন ত্রাণকাজে। দূর্গত এলাকা ঘুরবেন। দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াবেন, সাহস জোগাবেন। সাথে তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী। ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ সবকিছু সমন্বয় করছেন।

মনিরুল হুদা স্যারের বাড়ি ছিল মোহনার কাছে মেঘনা পাড়ে। স্যার বাড়ি গিয়েছিলেন আগের দিন। আর ফিরে আসেননি।

স্যার বদলি হয়ে চলে গেছেন চিরতরে। সপরিবারে, সবাইকে ছেড়ে। কোনদিন আর ফিরে আসবেন না স্যার। আমাদেরকে আর শাস্তি দেবেন না কোনদিন।

অপরাধবোধে ভুগি আমরা। মনেপ্রাণে স্যারের বদলি চেয়েছিলাম সত্যি। কিন্তু এমন বদলি তো নয়…

 

সুধাংশু শেখর বিশ্বাস : অতিরিক্ত সচিব

Advertisement বিনোদনসহ যেকোনো বিষয় নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও- rupalialo24x7@gmail.com
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রোদেলা জান্নাত (Rodela Jannat)। ছবি : ফেসবুক
ঢালিউড3 weeks ago

শাকিব খানের নতুন নায়িকা রোদেলা জান্নাত, কে এই রোদেলা : অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

রঙ্গন হৃদ্য (Rangan riddo)। ছবি : সংগৃহীত
অন্যান্য3 weeks ago

ভাইরাল রঙ্গন হৃদ্যকে নিয়ে এবার সমালোচনার ঝড়

পূজা চেরি। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড4 weeks ago

শাকিব খানেও আপত্তি নেই পূজা চেরির

শাকিব খানকে পেয়ে যা বললেন নতুন নায়িকা রোদেলা জান্নাত
ঢালিউড3 weeks ago

শাকিব খানকে পেয়ে যা বললেন নতুন নায়িকা রোদেলা জান্নাত

আয়েশা আহমেদ
অন্যান্য2 weeks ago

আয়েশা আহমেদের আবারও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় সাফল্য

শাকিব খান ও রোদেলা জান্নাত। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা3 weeks ago

বুবলীর পর এবার সংবাদ পাঠিকা রোদেলা জান্নাতকে নায়িকা বানাচ্ছেন শাকিব খান

পায়েল চক্রবর্তী
টলিউড3 weeks ago

টালিউড অভিনেত্রী পায়েল চক্রবর্তীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

ঢালিউড3 weeks ago

এক হচ্ছেন শাকিব খান-নুসরাত ফারিয়া

শিনা চৌহান
অন্যান্য4 weeks ago

শিনা এখন ঢাকায়

অঞ্জু ঘোষ। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড3 weeks ago

যে কারণে অবশেষে ঢাকায় ফিরলেন চিত্রনায়িকা অঞ্জু ঘোষ

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
নির্বাহী সম্পাদক : এ বাকের
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম