Connect with us

অসঙ্গতি সিরিজ

কু – প্রথা এবং কু – প্রভাব| তামান্না জেসমিন | অসঙ্গতি সিরিজ-৩

Published

on

কু - প্রথা এবং কু - প্রভাব তামান্না জেসমিন

কু – প্রথা এবং কু – প্রভাব| তামান্না জেসমিন | অসঙ্গতি সিরিজ-৩

প্রতিটি জীবজন্তু, পশুপাখি এবং মানুষ যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও আপ্রাণ চেষ্টা করে তার নিজেকে বাঁচাতে। প্রাণী জগতের অস্তিত্ব এভাবে টিকে আছে। পৃথিবীতে মনুষ্য সৃষ্টি হবার পর বিভিন্ন কাল পরিক্রমায় এমনকি যখন সভ্যতার আলো প্রস্ফুটিত হয়নি সেই সময় থেকেই মানুষ সাংকেতিক ভাষার মাধ্যমে পারস্পরিক ভাব আবেগ আদান-প্রদান করতো। সময়ের পরিবর্তনের গতিতে আদিম যুগ , প্রাচীন যুগের অবসানের পর মানুষ আজ এ  সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

সভ্যতার শুরুর আগে ও পরে ক্রমাগত চলছে বাঁচার নানা রকম প্রচেষ্টা। এই তৎপরতায় দুই রকম প্রচেষ্টা যোগ হয়েছে – প্রথা এবং কু-প্রথা।
দলবদ্ধ এবং সমাজবদ্ধ মানুষের সুদীর্ঘকালের নানা নিয়ম, আচার আচরণ, রীতিনীতি ইত্যাদি প্রজন্মের পর প্রজম্ম অনুসরণ করার পর সে সব প্রথা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তাই প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে অনেক অনেক নিকৃষ্ট প্রথা। আবার যোগ হয়েছে ইতিবাচক নানান রীতিনীতি, প্রথা। তাই আমাদের দেশের ঐতিহ্যে নববর্ষ, নবান্ন, নানা ধর্মীয় উৎসব উদযাপন, শিল্প সাহিত্য সাংস্কৃতি, শিক্ষা চিকিৎসা রাজনীতি – যা মানুষের জন্য ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে এবং নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায় এমন প্রথা বা রীতি সমাজ সংসার ও দেশের জন্য গৌরবের। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এখন পর্যন্ত কু- প্রথার কু- প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ ভাবে মুক্ত হতে পারেনি।

শিক্ষা, জ্ঞান বিজ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত মানুষ বাঁচার প্রয়োজনে নানা সময়ে নানা রকম কুসংস্কার ও কুপ্রথাকে অবলম্বন করেছে। ধ্যান ধারণা ও মনস্তাত্ত্বিক ভাবে বিভিন্ন রকম ভয় মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে। সেই অন্ধকার যুগ থেকে আজ এই সভ্যতার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ও মানুষ বর্তমান ও পরকালের মুক্তির পথ খুঁজতে কি ভয়ানক খারাপ প্রথাকে আকড়ে ধরে আছে তা রীতিমতো শরীর শিউরে ওঠার মতন। সেই প্রস্তর যুগ থেকে আরম্ভ করে অবান্তর ও নৃশংস প্রথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারা পৃথিবীতে। দুর্যোগ মহামারি মৃত্যু পরবর্তীতে নারকীয় যন্ত্রাণা ভোগ, স্রষ্টার নৈকট্য লাভ, রোগভোগ ,দুরবস্থা থেকে মুক্তি, দল, গোষ্ঠীর মানসিক দুর্বলতা ও ভয় থেকে বাঁচার আশায় অনেক কু-প্রথার সৃষ্টি হয়েছিল। মূলত অন্ধ অযৌক্তিক বিশ্বাস ই এর প্রধান কারণ।
সে সব সামাজিক ও ধর্মীয় আইনের আওতায় তা করণীয় এবং মেনে চলা প্রথা হিসেবে সচল থেকেছে। বিশ্বাস ও সাহসের অভাবে এবং অন্তর্নিহিত গবেষণায় না গিয়ে সেই সব চর্চাকে গতিশীল রেখেছে অজ্ঞানতা , অশিক্ষা আর দারিদ্রতার উপর ভর করে।

খুব বেশী দিনের কথা নয় , ভারতে সতীদাহ প্রথার কথা কে না জানে পৌরানিক কাহিনীতে এরকম আত্মহুতি একজন নারীকে স্বামীর প্রতি ভালবাসা ও সম্মান দেখাবার জন্য প্ররোচিত করা হতো সহমরনে। সেই যুগে সকলে এই সহমরন কে পূণ্যের কারণ বলে বিশ্বাস করতো। রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় সহমরন প্রথা বন্ধ করে দেওয়া হলেও এখনো মাঝে মাঝে শোনা যায়। বিবিসির একটি খবরে প্রকাশ হয়েছিলো যে, ভারতের মধ্যপ্রদেশের একটি গ্রামে একজন চল্লিশ বছর বয়ষ্ক নারী তার স্বামীর মৃত্যুর পর স্বেচ্ছায় সতীদাহ প্রথার মাধ্যমে চিতায় আত্মহুতি দিয়েছিলো। সেখানে নরবলী ও শিশুবলীর মতন অমানবিক ঘটনা ঘটতো অতি সহজে এবং এই ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসেও শোনা যায় এমন অপ্রত্যাশিত মর্মান্তিক ঘটনার খবর।

ভারতের আরো একটি সম্প্রদায়ের নাম অঘোরী। এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক খেয়ালের বশবর্তী হয়ে এই অঘোরী সাধুরা তাদের জীবনযাপন চিন্তাভাবনাকে আলাদা করে নিয়েছে স্বাভাবিক মানুষের থেকে। এরা শিবের অনুসারী এবং তার প্রার্থনায় ব্রত হয়ে কার্যকলাপের মাধ্যমে অতি ভক্তির নিদর্শনগুলো সত্যিই ভীতিকর। অলৌকিক ও আধ্যাত্মিকতা লাভের আশায় অঘোরী সাধুরা কাপড় পরিধান থেকে বিরত থাকে। চিতার মৃতদেহের ভস্ম ছাই তাদের মুখ ও সর্বাংগে মেখে জাগতিক , পার্থিব লোভ লালসা থেকে নিবৃত্ত হয় কঠোর অঘোরপন্থায়। এ অবস্থায় তারা এ জগতের মৃত জীবযন্তু, মানুষের মাংস খেয়ে থাকে। এই অঘোরীরা শীবের ও শ্মশানের সাধনার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সিদ্ধি লাভের চেষ্টায় ব্রত।দেবতার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে সারা পৃথিবীতে নরবলীর বিধানকে সবচেয়ে পবিত্র ও উৎকৃষ্ট বলে মানুষ ধারনা করতো। এমন অসংগতি নিসন্দেহে মর্মস্পর্শী।

একসময় প্রাচীন মিশরে ও নরবলী ছিলো বর্ণনাতীত। সেখানে মনিবের মৃত্যুর পরে তার শেবার জন্য জীবন্ত কবর হোতো জীবিত ভৃত্যদের। মায়া সভ্যতায় প্রাচীন মানুষেরা বৃষ্টির দেবতার তুষ্টির জন্য নিন্ম শ্রেণির অথবা যুদ্ধপরাধীদের গভীর কূয়োর মধ্যে নিক্ষেপ করে প্রান নেওয়া হতো। সূর্যকে রক্ষার জন্য আজকের  সমাজপতিদের দেওয়া নরবলী ছিল। আরো নৃশংস। বলীর শিকার মানুষের গলা থেকে শুরু করে একদম পেট পর্যন্ত কেটে দুভাগ করে ফেলে হৃদপিণ্ড টা বের করে উৎসর্গ করা হতো দেবতার সন্তুষ্টির জন্যে।
হাওয়াইতে একসময় বলীর শিকারকে পিটিয়ে মারতে মারতে তার নাড়িভুড়ি বের করে ফেলে সেই মৃতদেহ কাঁচা অথবা রান্না করে খাওয়া হতো পুরোহিতদের সাথে। ফিজিতেও স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রীকে ও শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলা হতো। আফ্রিকার ডাহোমে তাদের বার্ষিক উৎবের নাম ছিলো ‘জোয়েতানু’ এই উৎবের প্রধান আকর্ষণ ও ঐতিহ্যে ছিল। বাছাইকৃত দাস – দাসীকে রাজার সম্মুখে নরবলীর মাধ্যমে রাজাকে সম্মান প্রদর্শন করা।

বর্তমানে সভ্য পৃথিবীতে মানুষ নরবলীর মতন কু – প্রথাকে সমর্থন করে না তবুও ঐতিহ্যবাহী কিছু কিছু ধর্মে এখনো গোপনে এই প্রথা পালন করে চলছে। আদিকাল থেকে দাঁড়িয়ে থাকা অসঙ্গতির পাহাড় ক্ষয়ে গিয়ে সমতল হবে, অন্ধকার ঘুচে আলোর বিচ্ছুরণে মানুষ গাইবে শান্তির গান। সেই দিনের জন্য হয়তো আরো অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে।

 

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook

(ভিডিও)
অন্যান্য1 week ago

আলোচনায় ‘রস’ (ভিডিও)

মাসুমা রহমান নাবিলা (Masuma Rahman Nabila)। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা4 months ago

‘আয়নাবাজি’র নায়িকা মাসুমা রহমান নাবিলার বিয়ে ২৬ এপ্রিল

‘মিথ্যে’-র একটি দৃশ্যে সৌমন বোস ও পায়েল দেব (Souman Bose and Payel Deb in Mithye)
অন্যান্য4 months ago

বৃষ্টির রাতে বয়ফ্রেন্ড মানেই রোম্যান্টিক?

Bonny Sengupta and Ritwika Sen (ঋত্বিকা ও বনি। ছবি: ইউটিউব থেকে)
টলিউড4 months ago

বনি-ঋত্বিকার নতুন ছবির গান একদিনেই দু’লক্ষ

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)
অন্যান্য4 months ago

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)

ভিডিও6 months ago

সেলফির কুফল নিয়ে একটি দেখার মতো ভারতীয় শর্টফিল্ম (ভিডিও)

ঘটনা রটনা6 months ago

ইউটিউবে ঝড় তুলেছে যে ডেন্স (ভিডিও)

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌'কথার কথা' (প্রমো)
সঙ্গীত7 months ago

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌’কথার কথা’ (প্রমো)

সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া
সঙ্গীত7 months ago

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান গাইলেন সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া

মাহিমা চৌধুরী (Mahima Chaudhry)। ছবি : ইন্টারনেট
ফিচার8 months ago

এই বলিউড নায়িকা কেন হারিয়ে গেলেন?

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম