Connect with us

মতামত

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমার মানবতা আর বোধোদয় | মুনীর আহমেদ সাহাবুদ্দীন

Published

on

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমার মানবতা আর বোধোদয় মুনীর আহমেদ সাহাবুদ্দীন

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমার মানবতা আর বোধোদয়
মুনীর আহমেদ সাহাবুদ্দীন

আমার ছাত্রজীবনের প্রারম্ভে আমার বাবা, যিনি পেশায় অধ্যক্ষ ছিলেন, আমার জন্য ‘আমার জীবনের লক্ষ্য’ রচনা ইংরেজিতে লিখেছিলেন। শুরুটা ছিল `My aim in life is to be a man worthy of the name first’ অর্থাৎ ‘’আমার জীবনের লক্ষ্য সর্বপ্রথম মানুষের মত মানুষ হওয়া’। এটা আমার জীবনের একটা বড় দিক নির্দেশনা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ১৯৭২ সালে বাবার কর্মস্থল ছেড়ে নিজ জেলা বরিশালে চলে আসি। আমরা পিঠেপিঠি দুই ভাই বরিশাল বিএম স্কুলে ভর্তি হই। আমি কাস ফোরে আমার বড় ভাই ফাইভে। বর্ষীয়ান জয়ন্তবাবু স্যার আমাদের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ওনাকে স্কুলের কোথাও দেখা গেলে আমরা বাচ্চারা দৌড়ে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতাম। বাচ্চাদের সংখ্যা একটু বেশি হলে সালাম করার জন্য আমরা লাইন দিয়ে দাঁড়াতাম। আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধা তখন অতটা বোধগম্য না হলেও জানতাম জয়ন্তবাবু স্যার একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ওনাদের সন্মান সবার আগে করতে হয়।
১৯৭২ সালে বরিশাল বিএম স্কুলের আমার এক সহপাঠী অশোকের কথা মনে আছে। ও কাস ফোরে আমার সেকশনে পড়ত। প্রথম যখন ওকে দেখি ও আমার বেঞ্চে আমার পাশে বসা ছিল। ওর কোলে ছিল দুই-তিন বছরের ফুটফুটে ওর বোন। সারা ক্লাসে কোনো একটা টু শব্দ করেনি। কখনো অতটুকু জায়গায় ভাইয়ের কোলে ঘুমিয়েছিলো, আর যখন সজাগ ছিল আমাদের দুইজনের পাশে বসে নিঃশব্দে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। এখন ভাবি আর অবাক হই ওইটুকু বাচ্চা কীভাবে এতটা সময় নিঃশব্দে পার করেছিল।
ক্লাস শেষে জানলাম ওর বাবা আর মাকে মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদাররা নির্মম ভাবে মেরে ফেলেছিল। সঠিক মনে নেই, তবে সম্ভবতঃ ওর বাবা-মা যশোর অথবা কুষ্ঠিয়াতে নিহত হয়েছিলেন। ওরা তখন ওর মাসিমার কাছে বরিশাল ছিল। তারপর থেকে ওর মাসিমার বাসায় থাকে। ওইদিন ওর বোনটা ওর সঙ্গে স্কুলে যাবার জন্য খুব কাঁদছিল, ওর মাসীমা বললেন নিয়ে যেতে। ওকে বলেছিলেন এক-দুই পিরিয়ড পর স্যারকে বলে বাসায় চলে আসতে। আমি এই ঘটনাটি বহুবার আমার স্ত্রী আর মেয়েকে বলেছি। এইসব কথা বলতে গেলে স্মৃতিকাতর আবেগী মন আরো আবেগী হয়ে উঠে।

বাবার কর্মস্থল বদলের সাথে সাথে স্কুল পরিবর্তন করায় আমার সাথে অশোকের আর কখনো যোগাযোগ হয়নি। ওদের বেঁচে থাকা কঠিন, জানি না বেঁচে আছে কিনা। বেঁচে থাকলে ছোট ওই শান্ত-সৌম মেয়েটা আজ একজন মধ্যবয়সী মহিলা। তাদের জীবনে কতটুকু অর্জন- জানিনা। ওদেরকে খুঁজে বের করা আমদের আর সম্ভব হবেও না।

অথচ ১৯৭১এর সমর-চেতনা ‘সোনার বাংলাদেশ’ অর্জন, আমাদের সবাইকে অকাট্য করে ফেলেছিল। ধর্ম, শিক্ষা, অর্থ, যশ, মুক্তিপ্রাণ বরেন্য সন্তানদের শ্রেণিবিভাগ করতে পারেনি। তাঁরা সবাই ছিলেন লাল-সবুজ সামিয়ানার নিচে বীর মুক্তিযোদ্ধা। লাখো শহীদের বিনিময়ে অর্জিত এই সোনার বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে আজ এক অনন্য সৃষ্টি। আমাদের বড় সম্পদ আমরা গর্বিত জাতি।

আমরা আবার পারি আমাদের সেই চেতনায় ফিরে যেতে। এই জন্য অনেক সময়ের দরকার। তবে এই শুরুর ‘শুরুটা’ করার সময় এখন। দেশের মানুষদের যথাযথ সন্মান করা, গরীবদের আর্থিক দৈন্যতাকে বিবেচনা করা, দেশপ্রেমের একটি সুন্দর উদাহরণ। আমরা যেমন আমাদের আশপাশের গরীব বৃদ্ধ বিক্রতার সাথে দরাদরি না করে, যদি সামর্থ্য থাকে, কিনে নিতে পারি। রিকশাওয়ালাকে যতটুকু পারি ভাড়া দেই। ওদেরকে বাড়তি কিছুটা পয়সা সামর্থ্য হলে যেন দেই। ওরা এটা দিয়ে ঘরভাড়া দিবে, বাচ্চাদের পড়াবে অথবা বড়জোর একবেলা ভাল খাবে। আমাদের যাদের একটু বেশি সামর্থ্য ওদেরকে মাঝেমাঝে অবাক করে দিয়ে অল্প কিছু মাংশ-চাল কিনে নিয়ে ওদের বাসায় দিয়ে আসি। অবাকটা এই জন্য যে আমাদের চেতনার মানবতা এখনো তো মরেনি। সিএনজি, বাসচালক, আমাদের ড্রাইভার, এদের খারাপ ব্যবহারকে প্রত্রিক্রিয়া না করে যতটুকু পারি সহ্য করি। কারণ আমরা বুঝতে শিখছি যে এরা দিনের অর্ধেকের বেশির ভাগ সময় কর্মব্যস্ততায় কাটায়। সারাদিন মাথার মধ্যে ট্রাফিক, একে ঠেলে, ওকে ঠকিয়ে, চল-চাতুরী করে পুরা দিন কাটাতে হয়। এদের কোনো বিনোদন নেই। দিনশেষে মাথার মধ্যে পরদিনের রোজগারের চিন্তা করে ঘুমাতে হয়। ওদের এই অতুষ্ট ব্যবহার আমাদের অনুপযোগী পরিবেশ আর সমাজব্যবস্থা দায়ী। আর আমরা তো সমাজেরই অংশ।

 

আমাদের বাসায় কাজের সহায়তাকারী মানুষদের ‘বুয়া’ বা ‘কাজের মহিলা’ না বলে ‘খালা’ বা ‘আপা’ বলতে পারি। সবারই সন্মান প্রাপ্য। আমরা চাইলে, ওরা চেয়ারে-সোফায় বসতে পারে, মাটিতে না। খেতে হলে টেবিল-চেয়ারে বসে খাবে, আড়ালে-আবডালে, রান্নাঘরে, মাটিতে বা পিঁড়িতে বসে না। আলাদা, পুরোনো কিংবা ভাঙা কাপ-পিরিচ না, আমাদের মত একই কাপ-পিরিচে খাবে। ওদের বাচ্চাদের তাচ্ছিল্যের ‘তুই’ করে না বলে, তুমি বলতে পারি। ছোট বাচ্চারা আমাদের বাসায় কাজ করলে ওদেরকে পোশাকে যতটুকু পারি কিন্তু খাবারে আমাদের সন্তানদের মত বঞ্চিত না করি। ওদের বাবা-মা কখনো বেড়াতে এলে, আমরা যেন ওদেরকে অতিথিদের মত ব্যবহার করি। বিজয়ের এই মাস ডিসেম্বর। আমাদের এই চেতনার হাতিয়ার গর্জে উঠতে পারে ফের।

কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী একটি কবিতার একটি চয়ন মনে পরে গেল “ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন”। তাই বলতে পারি, আমরা পেরেছি, আমরা আবার পারব|

 

মুনীর আহমেদ সাহাবুদ্দীন : আবুধাবি প্রবাসী ব্যাংক কর্মকর্তা, প্রশিক্ষক এবং শিক্ষক

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook

(ভিডিও)
অন্যান্য1 week ago

আলোচনায় ‘রস’ (ভিডিও)

মাসুমা রহমান নাবিলা (Masuma Rahman Nabila)। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা4 months ago

‘আয়নাবাজি’র নায়িকা মাসুমা রহমান নাবিলার বিয়ে ২৬ এপ্রিল

‘মিথ্যে’-র একটি দৃশ্যে সৌমন বোস ও পায়েল দেব (Souman Bose and Payel Deb in Mithye)
অন্যান্য4 months ago

বৃষ্টির রাতে বয়ফ্রেন্ড মানেই রোম্যান্টিক?

Bonny Sengupta and Ritwika Sen (ঋত্বিকা ও বনি। ছবি: ইউটিউব থেকে)
টলিউড4 months ago

বনি-ঋত্বিকার নতুন ছবির গান একদিনেই দু’লক্ষ

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)
অন্যান্য4 months ago

লাভ গেম-এর পর ঝড় তুলেছে ডলির মাইন্ড গেম (ভিডিও)

ভিডিও5 months ago

সেলফির কুফল নিয়ে একটি দেখার মতো ভারতীয় শর্টফিল্ম (ভিডিও)

ঘটনা রটনা6 months ago

ইউটিউবে ঝড় তুলেছে যে ডেন্স (ভিডিও)

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌'কথার কথা' (প্রমো)
সঙ্গীত7 months ago

ওমর সানি এবং তিথির কণ্ঠে মাহফুজ ইমরানের ‌’কথার কথা’ (প্রমো)

সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া
সঙ্গীত7 months ago

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান গাইলেন সালমা কিবরিয়া ও শাদমান কিবরিয়া

মাহিমা চৌধুরী (Mahima Chaudhry)। ছবি : ইন্টারনেট
ফিচার8 months ago

এই বলিউড নায়িকা কেন হারিয়ে গেলেন?

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম