Connect with us

গল্প

বিশ্বরেকর্ড সমাচার | মাসউদুল হক

Published

on

বিশ্বরেকর্ড সমাচার | মাসউদুল হক
বিশ্বরেকর্ড সমাচার | মাসউদুল হক

বীরগঞ্জের বর্ষীয়ান মফস্বল সাংবাদিক আবদুল আলীম প্রতিদিনের মতো সেদিনও ভোরে ডায়াবেটিকস নিয়ন্ত্রণের আশায় হাঁটতে বের হয়েছিলেন। প্রতিদিন নিয়ম মেনে পৌরসভার বড় একটি দিঘী ঘিরে দশ চক্কর মারলেও সেদিন কি মনে করে যেন তিনি বীরগঞ্জ পৌরসভার সীমানা ছাড়িয়ে কাঁচা রাস্তায় নেমে গেলেন। অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশি পথ পারি দেয়ায় ফিরে আসার পথে তিনি পৌরসভার শেষ সীমানা বলে পরিচিত সুপ্রাচীন বটবৃক্ষের ছায়ায় খানিকটা সময় বিশ্রাম নেয়ার তাগিদ অনুভব করেন। বিশ্রাম নেয়ার অবসরে প্যান্টের ধূলো পরিস্কার করতে খানিকটা নীচু হলে, তাঁর নজর পড়ে, বটগাছের গুঁড়ির সাথে একাকার হয়ে পড়ে থাকা – একটি মানবদেহ। প্রথম তিনি ভেবেছিলেন, কোন মৃতদেহ। কিন্তু শরীরের ওপর একটি মলিন চাদর এবং সামনে একটা এ্যালুমিনিয়ামের দোমড়ানো-মোচড়ানো থালা দেখে তিনি বুঝে নিতে সক্ষম হন, ভিক্ষার আশায় কেউ একজন বটবৃক্ষের নীচে বৃদ্ধ মানুষটিকে রেখে গেছে। ক্ষণিকের জন্য আবদুল আলীমের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রম সৃষ্টি হয়। হঠাৎ করে তাঁর মনে পড়ে, তিনি যখন নিতান্তই শিশু ছিলেন এবং এই পথ ধরে স্কুলে যেতেন তখনও সোনা মিয়া নামের এক বৃদ্ধ প্রতিদিন এই একই বৃক্ষের নীচে বসে ভিক্ষা করতো। একটি মাটির সানকি নিয়ে ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত ভিক্ষার আশায় এই শতবর্ষী বটবৃক্ষের নীচে সোনা মিয়াকে বসে থাকতে দেখার স্মৃতি ষাট বছর বয়সেও পরিস্কার মনে পড়ে যায় আবদুল আলীমের। যদিও যুক্তি দিয়ে প্রমান করা কঠিন তবু আবদুল আলীমের কেন যেন মনে হয় – এই বৃদ্ধই সেই বৃদ্ধ – সোনা মিয়া।

নিজের মনের সংশয় দূর করতে আবদুল আলীম বৃদ্ধের কাছে সরে আসেন। অসংখ্য বলি রেখার বেড়াজাল ভেদ করে তিনি বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করেন, তার অনুমান সঠিক। মৃতের মতো পড়ে থাকা বৃদ্ধটি সোনা মিয়া-ই। বুকটা একটু ওঠা-নামা করা ছাড়া সোনা মিয়ার বেঁচে থাকার আর কোন চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। এক জোড়া মাছি, বড় কোন মাঠে নির্ভয়ে চড়ে বেড়ানো বাছুরের আনন্দ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সোনা মিয়ার মুখ জুড়ে। বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু বাতাস নিচ্ছে সোনা মিয়া, তার সবটাই নিচ্ছে মুখ হা করে। মাছি দুটি দূর-নিয়ন্ত্রিত কোন দ্রোনের মতো উড়তে উড়তে কখনো তার গালে বসছে আবার পরক্ষণে উড়তে উড়তে চলে যাচ্ছে মুখ গহবরে। বিশেষত মাছিদ্বয়ের মুখ গহবরে গমন ও নির্গমনের সাবলীলতা দেখে বুঝা যায়, সোনা মিয়ার শরীরের অলিগলি মাছিদের অনেকদিনের চেনা। সোনা মিয়ার বর্তমানে যে শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা তাতে লজ্জা-শরম নিয়ে ভাবার ক্ষমতা থাকার কথা না। পরিবারের লোকেরা তাদের লজ্জা শরমের ধারনাটি সোনা মিয়ার ওপর আরোপ করে দিয়েছে। পাছে লুঙ্গি খুলে গোপনাঙ্গ উন্মুক্ত হয়ে যায় সেই ভয়ে বাড়ি থেকে কোমরে শক্ত করে লুঙ্গি বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ কারনে কোমর থেকে গোড়ালি পর্যন্ত সোনা মিয়ার দেহ কাপড়ের আড়ালে ঢাকা। লুঙ্গি যেখানে শেষ সেখানে গাছের মরা ডালের মতো পায়ের গোড়ালি ও পাঁচ আঙ্গুল বের হয়ে আছে। সোনা মিয়ার বহুল ব্যবহার করা পায়ের আঙ্গুলগুলি এতটাই ভঙ্গুর দেখাচ্ছিল যে, মনে হচ্ছিল ছোট্ট কোন পাখিও যদি সেই আঙ্গুলগুলিতে বসে তবে তা পট্ করে ভেঙ্গে পড়বে। তুলনামূলকভাবে মজবুত ভেবেই কি-না একটি গিরগিটি তার বাম পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ওপর দাঁড়িয়ে আশেপাশের প্রকৃতি ও জীবন গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। সামান্য গিরগিটির ভার বহন করতে গিয়ে সোনা মিয়ার পায়ের বুড়ো আঙ্গুল র্তির্তি করে কাঁপছিল। আবদুল আলীমের ছায়া লম্বা হয়ে সোনা মিয়ার শরীরে পড়লে মাছিদ্বয় এবং গিরগিটি উভয় প্রজাতি ভীত হয়ে ওঠে। তাদের পলায়ন প্রক্রিয়া দেখে আবদুল আলীম অনুভব করেন, ক্ষুদ্র প্রাণীরা প্রাণ থাকলেই মানুষকে প্রাণীর মর্যাদা দেয় না। তাদের কাছে, যে পাল্টা আঘাত করার শক্তি রাখে সে-ই প্রাণীর মর্যাদা পায়। সোনা মিয়া বয়সের ভারে এতই নুজ্ব্য যে সামান্য মাছি কিংবা গিরগিটিকে পাল্টা আঘাত করার শক্তিও অবশিষ্ট নেই। সনাক্তকরন প্রক্রিয়া সমাপ্ত হলে আবদুল আলীম নতুন করে চিন্তিত হয়ে ওঠে। তার মাথায় ঘুরপাক খায় একটি ভাবনা। এত দীর্ঘ সময় কিভাবে বেঁচে আছে – সোনা মিয়া?

আবদুল আলীম হিসেব করে দেখেন, তার নিজের বয়সই ষাট। শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে তার মনে হয়, সোনা মিয়ার বয়স একশত বিশ কিংবা একশত ত্রিশের কম হবার কথা নয়। এই ভাবনা তাকে এত আলোড়িত করে যে, তিনি সোনা মিয়ার ওপর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে ফেলেন। বাসায় ফিরে ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে দেখতে পান, তখন পর্যন্ত পৃথিবীর প্রবীনতম মানুষটি জাপানের নাগরিক। তার নাম ইয়াসুতারু কইদে। যার বয়স একশত বার বছর। এ খবরে তিনি উত্তেজনাবোধ করেন। তিনি আরো সার্চ দিয়ে জানতে পারেন যে, এ পর্যন্ত পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকার রেকর্ড ফ্রান্সের নাগরিক জিনি কালমেট-এর। যিনি বেঁচে ছিলেন- একশত বাইশ বছর। আবদুল আলীমের মনে হয়, সোনা মিয়া পৃথিবীর বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষতো বটেই; তিনি আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবী মানুষ কি-না তাও গবেষণা করে দেখা দরকার।

পাছে অন্য কোন সাংবাদিক বিষয়টি অনুধাবন করে আবদুল আলীমের আগে রিপোর্ট করে দেন এই ভেবে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে দুপুর নাগাদ তিনি সোনা মিয়ার পুতি সবুর আলীর বাড়িতে উপস্থিত হন এবং তাদের সাথে কথা বলে সোনা মিয়ার এত দীর্ঘজীবন লাভের গোপন কৌশল এবং প্রকৃত জন্ম সাল না হলেও সম্ভাব্য একটি জন্ম সাল নির্ণয়ের চেষ্টা চালান। কিন্তু তাঁর বাড়ির লোকেরা সোনা মিয়া কি খায়, কোথায় যায়, কিভাবে যতœ-আত্তি করে তাকে এত দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে- তা নিয়ে অনেক তথ্য দেয় কিন্তু জন্ম তারিখ বা সাল নিয়ে কোন তথ্য দিতে পারে না। কিভাবেই-বা দিবে? সোনা মিয়ার সময়ের কেউই-তো আর বেঁচে নেই। সোনা মিয়ার তিন পুত্র ও চার কন্যার সকলে মৃত্যুবরণ করেছেন অনেক আগেই। তার বিভিন্ন পুত্র ও কন্যাদের ঘরে যেসব নাতি-নাতনী জন্ম নিয়েছে তাদেরও প্রায় সবাই মৃত। সোনা মিয়ার বড় পুত্র মৃত্যুবরণ করার আগে নিজ পুত্রদের বলে গিয়েছিল, তার পিতা লক্ষীর মতো। যে তাকে দেখাশুনা করবে তার ঘরে অভাব হানা দিবে না। যদি কেউ তাকে অবহেলা করে তবে তার ক্ষতি অবধারিত। একটি মিথের জন্ম দিয়ে সোনা মিয়ার বড় পুত্র পিতার জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যত তৈরি করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পিতার সৃষ্ট মিথকে অবজ্ঞা করে অভাবের তাড়নায় বড় নাতি সোনা মিয়াকে এক সময় বাড়ি থেকে বের করে দিলে পনের দিনের মাথায় বড় নাতির বড় পুত্র বজ্রাঘাতে মৃত্যুবরন করে। এ ঘটনায় শোকার্ত নাতি অপরাধবোধে ভুগতে থাকে। পাছে আরো ক্ষতি হয়- এই ভয়ে এবং জ্ঞাতি-গোষ্ঠির মুরুব্বীদের সুপারিশে বিশ দিন পর কান্তজীর মন্দিরের বারান্দা থেকে সোনা মিয়াকে পুনরায় ঘরে তুলে আনে।

সোনা মিয়ার পরিবার ত্যাগ এবং একটি মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে ফিরে আসা, জ্ঞাতি-গোষ্ঠির মনোজগতে এক সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। সোনা মিয়ার সন্তুষ্টি এবং অসন্তুষ্টির সাথে তার উত্তর পুরুষরা নিজেদের জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য জড়িয়ে ফেলে। এই জড়িয়ে ফেলার কারনে সর্বগ্রাসী অভাবের মধ্যেও সোনা মিয়া দীর্ঘদিন সুখী জীবন যাপনে সক্ষম হয়েছে। পরবর্তী সময় নাতি এবং মুরুব্বীদের মৃত্যুর কারনে মিথের প্রাবল্য কমে আসলে সোনা মিয়াকে পুনরায় ভোরবেলা বট গােেছর নীচে একটি এ্যালুমিনিয়ামের পাত্রসহ প্রথমে বসিয়ে এবং পরে শুইয়ে দেয়া হতে থাকে। তুলনামূলকভাবে অধিকতর বিজ্ঞানমনস্ক ও বৈষয়িক পরবর্তী প্রজন্ম হিসেব করে দেখে যে, গাছের নীচে দিনের অধিকাংশ সময় কাটিয়ে এবং অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক চহিদা মেটানোর জন্য কোনরূপ বায়না না ধরে সোনা মিয়া প্রতিদিন যা আয় করে তা একজন সক্ষম যুবকের রুজির চেয়ে কম নয়। এ কারনে জিন্দা লাশ সোনা মিয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় কোন ঘাটতি দেখা যায়নি। এসব তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘজীবন লাভের বিষয়ে একটা পরিস্কার ধারনা পেলেও জন্ম তারিখ নির্ণয়ে আবদুল আলীম কোন ধারনা লাভে সক্ষম হননি।

উত্তর পুরুষদের কাছে সোনা মিয়ার জন্ম তারিখ আকাশের চাঁদ দিয়ে ফুটবল খেলার মতো অবান্তর মনে হয়। সোনা মিয়ার বাড়ির লোকের কাছে একশত বছর আগেতো বটেই, এখনও বাচ্চার জন্ম তারিখ স্মরণ রাখা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না। কিছুদিন আগেও বছর না ঘুরতেই বিবাহিত নারীর পেট উঁচু হয়ে ওঠা এবং ঢেঁকিতে পাঁড় দেয়া অবস্থায় আচমকা একটি শিশুর শরীরের তলদেশ দিয়ে বের হয়ে এসে কান্না জুড়ে দেয়া ছিল-এ অঞ্চলের নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। তাছাড়া শুক্রাণু -ডিম্বাণুর মিলিত হবার সুনির্দিষ্ট কোন সময় না থাকায় এবং ধর্মীয় বিধান অবলম্বন করে একাধিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার সুবর্ণ সুযোগের সদ্বব্যবহারের কারনে এই নিত্য-নৈমিত্তিক বিষয়টি প্রাচীনকালে একটি পরিবারে এত ঘন ঘন ঘটতো যে ভুলক্রমেও কোন পিতা-মাতা জন্ম তারিখ স্মরণ রাখতে আগ্রহী হয়ে উঠতো না। তাছাড়া আমাদের পূর্ব পুরুষদের নানারকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার পাশাপাশি বিশাল পরিবারের দুই বেলা অন্ন সংস্থানের কাজটিতে এত বেশি মনোনিবেশ করতে হতো যে, সন্তানের বয়স মনে রাখা তাদের কাছে সোনা দিয়ে বদনা বানানোর মতো বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

তবুও সন্ধ্যা নাগাদ সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে আবদুল আলীম পত্রিকার মফস্বল পাতার সম্পাদকের সাথে আলাপ করেন। কিন্তু সম্পাদক খুবই বিরক্ত হয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন, ’ আপনার বয়স ষাট, তার সাথে শৈশবে দেখা সোনা মিয়ার বয়স সত্তুর ধরে যোগ করে দিলেন আর পৃথিবীর প্রবীনতম মানুষ বের করে ফেললেন? এইভাবে অনুসন্ধানী রিপোর্ট হয়?’

একটা জন্ম তারিখের অভাবে বিশাল আবিষ্কারটি অন্ধকারে থেকে যাবে – এটা আবদুল আলীম কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি নিরূপায় হয়ে নিজের পত্রিকা বাদ দিয়ে সংবাদের অভাবে বুভুক্ষের মতো বসে থাকা অনলাইন নিউজ পোর্টালে সোনা মিয়ার বলিরেখায় পরিপূর্ণ মুখের একটি ছবি দিয়ে সংবাদ প্রেরন করেন। ঘন্টাখানেকের মধ্যে সেই বলিরেখায় পরিপূর্ণ ছবিতে ক্যাপশান দিয়ে খবর ছাপা হয়, ’ সোনা মিয়া কি পৃথিবীর প্রবীনতম মানব?’

এ সংবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় উঠে যায়। ইতোপূর্বে একসাথে জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং দলগতভাবে হাত ধুয়ে বাংলাদেশ বিশ্বরেকর্ড গড়লেও একক প্রচেষ্টায় কোন বিশ্বরেকর্ড করতে সক্ষম হয়নি। সোনা মিয়ার মাধ্যমে একটি বিশ্বরেকর্ড গড়ার সম্ভাবনায় ফেসবুক ব্যবহারকারী স্থ’ূলদেহী তরুন সমাজ উল্লাসিত হয়ে ওঠে। প্রথমবারের মতো নিউজ পোর্টালের একটি খবরে এক ঘন্টায় এক লক্ষ লাইক, তিনশত বাহাত্তুরটি কমেন্ট পড়ে। সংবাদটি শেয়ার হয় দুই হাজার বার। বাংলাদেশে এই কিছুদিন আগেও সংবাদপত্র আলোচনা তৈরি করতো এবং মানুষ সংবাদপত্রকে অনুসরন করতো। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারের কারনে এবং ঘরে ঘরে সিটিজেন জার্নালিজমের ধারনা জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারনে ইদানিং বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে অনুসরন করতে শুরু করেছে। ফলে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে একটি বিশ^রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার খবরকে প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া অস্বীকার করতে পারে না। সোনা মিয়া যেখানে ভিক্ষা করতো সেই বট গাছের নীচে দলে দলে সমবেত হতে থাকে সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, রাজনৈতিক নেতা এবং বেকার ও কর্মঠ উভয় প্রকার যুবকেরা। কানের কাছে চিৎকার করেও কোন প্রশ্নের জবাব না পেয়ে বিভিন্ন নিউজ মিডিয়ার কর্মীরা নিজের দক্ষতা প্রদর্শনের জন্য সোনা মিয়ার শরীরের দুই পাশে দুই পা রেখে মুখের উপর ক্যামেরা জুম ইন এবং আ্্উট করতে থাকে। তাঁরা সোনা মিয়ার মুখের বলিরেখার ঘনত্ব, দন্তের অনুপস্থিতি এবং কোটরের ভেতর হারিয়ে যাওয়া চোখের ছবি দিয়ে প্রমান করতে সচেষ্ট হয় যে, সোনা মিয়া-ই পৃথিবীর প্রবীনতম ব্যক্তি।

ক্যামেরাম্যানরা সোনা মিয়ার শরীরের ওপর থেকে নেমে যেতেই সেলফি গ্রæপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। সোনা মিয়ার মুখের সাথে মুখ লাগিয়ে ছবি তুলতে হলে মাটিতে শুয়ে পড়তে হবে। সেটা খুব কষ্ট সাধ্য বিষয়। আবার পৃথিবীর সম্ভাব্য প্রবীনতম ব্যক্তির সাথে একটি ছবি তুলে না রাখলে বীরগঞ্জের বীরদের মান-সম্মান অবশিষ্ট থাকে না। সার্বিক পরিস্থিতি বিচেনায় স্থানীয় সরকার দলের একদল নেতা সোনা মিয়াকে টেনে গাছের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে দেয়। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে প্রবীনতম ব্যক্তির হা-করা ঘুমন্ত মুখের পাশে নিজের মুখ রেখে একক এবং যৌথ সেলফি তোলা চলতেই থাকে ।

আশেপাশে এত মানুষের ভীড়েও সোনা মিয়ার কোন ভাবান্তর হয় না। দু’একবার চোখ খুলে তাকাতে চায় কিন্তু বলিরেখার আড়াল থেকে সেই চোখ ফুটে উঠতে এত দীর্ঘ সময় নেয় যে, তিনি আবার ঘুমিয়ে পড়েন। বয়সের কারনে তার শ্রবন শক্তিও প্রায় শেষ। কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছেন তাও বছর বিশেক আগে। ইশারা করতে হাত বা আঙ্গুল যতটা নাড়ানো প্রয়োজন ততটা শক্তিও তাঁর অবশিষ্ট নেই। সুতরাং সোনা মিয়ার জিন্দা লাশের ওপর নির্যাতন চলতে থাকে বিকেল পর্যন্ত। শেষে বিকেলের দিকে এলাকার কিছু বিবেকবান মানুষের আহবানে সাড়া দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোনা মিয়াকে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সোনা মিয়ার ওপর চলমান নির্যাতনের সাময়িক অবসান ঘটে। পত্রিকায় খবর ছাপার পর এবং একটি প্রাইভেট চ্যানেল লাইভ অনুষ্ঠান প্রচারের পর দূর -দূরান্ত থেকে ইতোমধ্যে অনেক তরুন-তরুনী একটি সেলফি তোলার আশা নিয়ে বীরগঞ্জের দিকে রওয়ানা হয়েছিল। তাঁরা বীরগঞ্জে উপস্থিত হয়ে দেখে, বিশে^র প্রবীনতম ব্যক্তি সোনা মিয়াকে গাছ তলা থেকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় সোনা মিয়ার সাথে সেলফি তোলা সম্ভব নয়। কিন্তু বাড়ির কাছে থাকার পরও পৃথিবীর প্রবীনতম ব্যক্তির সাথে সেলফি তুলতে পারবে না ভেবে তরুন-তরুনীরা ক্রমশ হিং¯্র হয়ে ওঠতে থাকে। তারা দলবদ্ধ হয়ে, সেলফি তোলার জন্য এক পর্যায়ে হাসপাতালের সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করতে থাকে। এ অবস্থায় স্থানীয় সাংসদের অনুরোধে কর্তৃপক্ষ জেলা থেকে এক প্ল্যাটুন আর্মস পুলিশ ব্যাটালিয়ন নিয়োগ করে হাসপাতালে বিশেষ প্রহরার ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয় ।

বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চাপে, জন্মের পর থেকে কোন কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে না পারা ’ জাতীয় জরা-বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের’ একদল গবেষক পরদিন দুপুর নাগাদ বয়স মাপার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে উপস্থিত হলে বীরগঞ্জ উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সটি একটি চিড়িয়াখানায় রূপান্তরিত হয়। সোনা মিয়ার প্রকৃত বয়সটি জানার জন্য সারা দিনাজপুর’তো বটেই বৃহত্তর রংপুর জেলার সকল কৃষক লাঙল ফেলে, ব্যবসায়ী দোকানের সাটার বন্ধ করে, কর্মচারী মায়ের অসুখের অজুহাত দেখিয়ে – বাস এবং নসিমনে চড়ে বীরগঞ্জে ভীড় জমাতে থাকে। এ বিশাল জমায়েতের কথা শুনে ঝাল-মুড়ি ও বাদাম বিক্রেতার পাশাপাশি নানারকম খেলনা বিক্রির আশায় ব্যবসায়ী সম্প্রদায় উপস্থিত হলে বীরগঞ্জ হেলথ কমপ্লেক্স ঘিরে একটি মেলা বসে যায়। ঘন্টা চারেক নিবিড় পর্যবেক্ষনের পর কিছু স্যাম্পল নিয়ে জরা বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের গবেষক দল বের হয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে দলের প্রধান ভারি চশমার ল্যান্সের ভেতর দিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জানিয়ে দেন, ’এখনই মন্তব্য করা সম্ভব নয়। পরীক্ষার ফল পেতে আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।’

প্রকৃতির আশ্রয়ে লালিত-পালিত সোনা মিয়া দীর্ঘদিন সুস্থ থাকার পর জরা-বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের গবেষক দলের খোঁচাখুঁচি, স্যালাইনের মাধ্যমে তরল খাদ্য প্রদান এবং মল-মূত্র ত্যাগের জন্য ডায়াপার পড়ানোর মতো পরিস্থিতিতে পড়ে অসুস্থ বোধ করতে শুরু করে। সোনা মিয়ার শ্বাস-কষ্ট শুরু হয় এবং মল-মূত্র ত্যাগ বন্ধ হয়ে যায়। একদল স্থানীয় পরিবেশবাদি দাবী জানায়, তাকে যেন আবার পুরনো বটবৃক্ষের তলায় সরিয়ে নেয়া হয়। তাঁরা আবেগতাড়িত হয়ে জানায়, ঐ বটবৃক্ষের মুক্ত হাওয়া-ই সোনা মিয়ার দীর্ঘায়ূর মূল রহস্য।

কিন্তু বিজ্ঞান একবার কোথাও হাত লাগালে সেখান থেকে বিজ্ঞানের হাত সরিয়ে দেয়া কঠিন। সুতরাং গাছ তলায় সরিয়ে নেয়া আর সম্ভব হয়নি। বরং বাংলাদেশের একজন ব্যক্তি দীর্ঘ জীবন লাভ করে গিনেস রেকর্ডে নাম লেখাতে যাচ্ছে – এই খবরে সর্বাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করে সোনা মিয়াকে বাঁচিয়ে রাখতে সকল পক্ষ তৎপর হয়ে ওঠে। উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে, অন্তত বিশ^রেকর্ডের খাতায় নাম ওঠানো পর্যন্ত, সোনা মিয়াকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ঢাকা পাঠানোর নির্দেশনা আসে। পৃথিবীর সম্ভাব্য প্রবীনতম ব্যক্তি বিবেচনা করে, সরকার তাঁর চিকিৎসার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার প্রেরন করতে মনস্থির করে। কিন্তু হাসপাতাল সংলগ্ন হেলিকপ্টার নামার মতো শক্ত মাটি এবং খোলামেলা জায়গা খুঁজতে অনেকটা সময় ব্যয় হয়ে গেলে পৃথিবীর সম্ভাব্য প্রবীনতম মানুষটি আচমকাই ইন্তেকাল করে ফেলেন। তার এই ইন্তেকালের সাথে সাথে তিনদিন ব্যাপি জমায়েত ভাংগা হাঁটে রূপ নেয়। সরকারের অহেতুক সময়ক্ষেপন এবং অদক্ষতার জন্য একটি বিশ^রেকর্ড বাঙ্গালির হাতছাড়া হয়ে গেছে দাবী করে যুবকরা একাধিক সরকারি অফিস ভাঙচুর এবং একটি সরকারি কাজে নিয়োজিত লেখা বেসরকারি ট্রাকে আগুন দিতে দিতে বাড়ি ফিরতে থাকে। বীরগঞ্জে উপস্থিত হতে পারেনি কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সোচ্চার ছিল এমন তরুনেরা সম্ভাব্য বিশ্বরেকর্ড হাতছাড়া হওয়ায় মনের কষ্টে মুষঢ়ে পড়ে। দলবদ্ধ হয়ে সারা বাংলাদেশের তরুন সমাজ তাদের প্রোফাইল পিকচার কালো করে দেয় এবং স্ট্যাটাস দেয়, ’আরআইপি, সোনিয়্যা মিয়ান’।

সোনা মিয়ার মৃত্যুর দিন তিনেক পর বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমানিত হয় যে, সোনা মিয়া একশত উনচল্লিশ বছর বেঁচে ছিলেন। তবে যেহেতু বয়স প্রমানের আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এবং বাংলাদেশের গবেষকদের গবেষণা পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানের নয় সেহেতু গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ সোনা মিয়াকে তাদের রেকর্ড বইয়ে স্থান দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষকে বেশ কিছুদিন অশ্লীল-অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে নানা রকম স্ট্যাটাস প্রদান চলতে থাকে। পাশাপাশি ফেসবুক ব্যবহারকারীরা সোনা মিয়াকে রেকর্ড বইয়ে স্থান না দেয়ার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর যে একটি গোপন ষড়যন্ত্র ক্রিয়াশীল ছিল তাও আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়।

তবে বীরগঞ্জবাসী বিশ্বরেকর্ডের তোয়াক্কা করে না। তারা দীর্ঘদিন যে বটবৃক্ষের তলায় বসে বা শুয়ে সোনা মিয়া ভিক্ষা করতো সেই বটবৃক্ষের তলায় সোনা মিয়াকে সমাহিত করে। এবং স্থানীয় যুবকেরা চাঁদা তুলে সেই চাঁদার টাকার কিঞ্চিৎ অংশ ব্যয় করে সোনা মিয়ার কবর পাকা করে এবং কবর ঘিরে প্রাচীর তুলে একটি মাজারের পত্তন ঘটায়। তারা সোনা মিয়ার কবরের গায়ে বড় বড় হরফে লিখে দেয়- মরহুম সোনা মিয়া, জন্ম ১৮৭৮; মৃত্যু ২০১৭ ইং তারিখ।

শোনা যায়, আজকাল উত্তরবংগ সফরে গেলে লোকজন কান্তজীর মন্দির দেখেই ফিরে যায় না। তারা আরেকটু এগিয়ে গিয়ে একসময় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বিশ^রেকর্ডে নাম ওঠাতে না পারা পৃথিবীর প্রবীনতম ব্যক্তি সোনা মিয়ার কবর জিয়ারাত করে বাড়ি ফিরে যায়। আবার কেউ কেউ সোনা মিয়ার কবর জিয়ারাত শেষে বাড়ি ফেরার পথে সময় পেলে কান্তজীর মন্দির দেখে আসে।

Advertisement বিনোদনসহ যেকোনো বিষয় নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও- rupalialo24x7@gmail.com
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রোদেলা জান্নাত (Rodela Jannat)। ছবি : ফেসবুক
ঢালিউড3 weeks ago

শাকিব খানের নতুন নায়িকা রোদেলা জান্নাত, কে এই রোদেলা : অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

রঙ্গন হৃদ্য (Rangan riddo)। ছবি : সংগৃহীত
অন্যান্য3 weeks ago

ভাইরাল রঙ্গন হৃদ্যকে নিয়ে এবার সমালোচনার ঝড়

পূজা চেরি। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড4 weeks ago

শাকিব খানেও আপত্তি নেই পূজা চেরির

আয়েশা আহমেদ
অন্যান্য2 weeks ago

আয়েশা আহমেদের আবারও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় সাফল্য

শাকিব খানকে পেয়ে যা বললেন নতুন নায়িকা রোদেলা জান্নাত
ঢালিউড3 weeks ago

শাকিব খানকে পেয়ে যা বললেন নতুন নায়িকা রোদেলা জান্নাত

শাকিব খান ও রোদেলা জান্নাত। ছবি : সংগৃহীত
ঘটনা রটনা3 weeks ago

বুবলীর পর এবার সংবাদ পাঠিকা রোদেলা জান্নাতকে নায়িকা বানাচ্ছেন শাকিব খান

পায়েল চক্রবর্তী
টলিউড3 weeks ago

টালিউড অভিনেত্রী পায়েল চক্রবর্তীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

ঢালিউড3 weeks ago

এক হচ্ছেন শাকিব খান-নুসরাত ফারিয়া

শিনা চৌহান
অন্যান্য3 weeks ago

শিনা এখন ঢাকায়

অঞ্জু ঘোষ। ছবি : সংগৃহীত
ঢালিউড3 weeks ago

যে কারণে অবশেষে ঢাকায় ফিরলেন চিত্রনায়িকা অঞ্জু ঘোষ

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
নির্বাহী সম্পাদক : এ বাকের
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম