fbpx
Connect with us

গল্প

জয় করেছে বিজয় | রেহানা আক্তার

Published

on

জয় করেছে বিজয় | রেহানা আক্তার

জয় করেছে বিজয় | রেহানা আক্তার

সারারাত ধরে ইউটিউব, গুগল, হটস্ অ্যাপ এগুলোর কাজ করে সকালে ঘুম হতে আর ওঠা হয়নি। মিথিলা’র একশটি মিস কলড্ উঠে আছে মোবাইলে।
সর্বনাশ আজ খবর আছে, থিসিস কপি টা তো আমার কাছে? সকাল দশটায় ক্যাম্পাসের গেটে পৌঁছানোর কথা, এখন বেলা বারোটা। আল্লাহ আমায় রক্ষা করো? ওর গালির হাত হতে আমাকে বাচাঁও। মা দরজা নক্ করছে। কি রে জয়? তুই কি আজ সারাদিন ঘুমোবি? আশ্চর্য ছেলে বটে একটা? সারা রাত জেগে ওই ল্যাপটপে কি এত কাজ তোর?
তাছাড়া কাস তো মিস্ করলি।
সত্যি, তুই আমাকে খুবই জ্বালাতন করছিস।
আজ রাতে তোর বাবা’র সাথে এর একটা বিহিত করবো।
ধ্যাৎ, কেন এত বিরক্ত করছো?
মা,
আজ কি রান্না হয়েছে? আমার খিচুড়ি খেতে ইচ্ছে করছে ইলিশ মাছ দিয়ে।
মা’র আর কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।
পায়ের নীচে পড়ে থাকা নকশী কাথাঁটি টেনে নিয়ে আবারও ঘুমের চেষ্টা। মোবাইল আবার বেজে চলছে , হাতে নিয়ে দেখি রিফাত কল করেছে। হুম, হ্যালো… এই জয় তুই এখনও বাসায়? ব্যাটা তুই তাড়াতাড়ি ক্যাম্পাসে চলে আয়?
না রে আজ আর যাবো না ।
মানে কি দোস্ত? আজ না সুবল স্যারের সাথে তোর দেখা করার কথা? তোর ওই ওল্ডহোম প্রোজেক্ট এর বিষয়ে ?
তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, তুই খালি ঘুমাই ঘুমাই স্বপ্ন দেখ? যতসব অর্কমার ঢেঁকি।
মা আবার ডাকছে, কি রে জয় উঠলি?
নাহ্ আমি আবার প্যারিস চলে যাবো, আমাকে একটু ঘুৃমাতে দেয়া হচ্ছে না?
প্যারিসেই জন্ম আমার। বাবা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। ও’ লেভেল পর্যন্ত ওদেশেই হয়েছে পড়ালেখা। বাবা মা’ র কারনেই বাংলা ভাষাটি ভালভাবে শিখতে পেরেছি। বাড়িতে কেউ ইংরেজিতে কথা বলতে পারবে না। এটা ছিল বাসার নিয়ম। ছোট ভাই জনি এসব মানতে চাইতো না। এ নিয়ে বহু বকাও খায় সে। এত ভাল ইংরেজি জানার পরও আমি সবসময় বাংলাতেই কথা বলি। তবে বাসার কাজের সহযোগী ছেলে সুন্দর আলী, সব সময় এসে বিরক্ত করে, তার একটা কথা, জয় ভাই মোর নাম সুন্দর আলী, ছোট বেলায় সুন্দর ছিলাম হেইআর কারণে মোর নানী মোর নাম রাখছে সুন্দর আলী? তয় কথা একখান, মোরে আপনি ইংরেজি শিখাইবেন ? মুই যারে বিয়া করমু হের লগে যেন ডাস ডাস করি ইংরেজি কইবার পারি। সুন্দর আলীর কথা মনে হতেই হো হো করে হেসে উঠি। এবার ঘুমের রেসটা কিছুটা কমেছে। ফ্রেস হয়ে সোজা চলে আসি ডাইনিং টেবিলে।
একটা গন্ধ পাচ্ছি, ও হুররে ইলিশ মাছ আর খিচুড়ি ?
মাকে ডাকতে থাকি । মা, ছেলের ডাকে বের হয়ে আসে। খাবার কোন রকম খেয়ে রিফাতকে কল করা হয়। গায়ের জ্যাকেটটি পড়ে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে পড়ে। বিশ মিনিটির মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর হাকির মোড়ে এসে যায়। রিফাত দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। কিরে দোস্ত? এত অস্থির কেন হয়েছিস? হবো না? তোর আজ একটা গুরুত্বর্পূণ কাজ ছিল, তুই সুবল স্যারকে বলেছিস আজ একটা বৃদ্ধাশ্রম দেখতে যাবি এবং একটা প্রজেক্ট প্রপোজাল তৈরি করে তোর প্যারিস এর বন্ধুর কাছে পাঠাবি অনুদানের জন্য? কিন্তুু তুই দুপুর বরোটা পর্যন্ত ঘুম দিলি? এখন স্যার কি মনে করবে বল? আচ্ছা, জায়গাটা যেন কোথায় ছিল রে? জয় খুব ভাব নিয়ে জানতে চাইলো। এই তো গাজীপুরের দিকে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এর পাশেই। ওকে রিফাত চল? স্যারের বাসায় যাবো। স্যারকে নিয়ে এখনই রওনা দিব। জয়, তোর মাথাটা একদম গেছে? এখন বাজে তিনটা, ওখানে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। আগামীকাল আমরা যাবো। শোন জয়? তুই বিদেশে লেখাপড়া করে, দেশের টানে আবার ফিরে এসেছিস, কাজ করছিস দেশের জন্য, এটা আমাদের জন্য অনেককিছু। আচ্ছা, তুই রাত জেগে কি অত কাজ করিস বলতো? শুনবি?

গতরাতে ইন্টানেট এ কাজ করছি, রাত আনুমানিক দুইটার দিকে কেন জানি মনে হলো ঘরে নূপুরের আওয়াজ, দামী পারফিউম এর স্মেল। প্রথমে মনে হলো কয়েকরাত জেগে কাজ করছি, হয়তো ঘুম না হবার কারনেই এমনটা হচ্ছে , কিন্তুু না জানিস? কে যেন আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলছে, হ্যালো জয়? তুমি তো একজন ভাল মানুষ। দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনবে তাই তো? আমি খুব কষ্টে আছি। জানিস রিফাত? আমার শরীর তখন ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল নড়াচড়া করতে পারছিলাম না, কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। কথা বলতে গিয়ে মুখে আটকে যাচ্ছিল কথা। ভয়ও লাগছিল। তারপরও সাহস নিয়ে বললাম কে তুমি? এই ঘরে ঢুকলে কি করে? হাহাহাহা করে হাসতে হাসতে বললো কেন আমাকে চিনতে পারছো না? আমিতো তোমার সাথে সব সময় থাকি। মানে? মানে বুঝলে না জয়? ভাবো ভাবতে থাকো, ঠিক বুঝতে পারবে আমি কে?

এদিকে আমার শরীর ঠান্ডা থেকে গরম হতে থাকলো, আমি কোথাই বুঝতে পারছিলাম না। এক সময়ে ল্যাপটপ টা সরিয়ে রেখে বিছানার চাদরটা মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে নিলাম। তারপর তো মায়ের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙ্গলো। রিফাত এমন এক হাসি দিলো যে রাস্তার সমস্ত মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে। দুবন্ধু মিলে চলে যাই মিথিলাদের বাসায়। মিথিলা থাকে বেইলী রোডে। বাবা মা দুজনেই সরকারি কর্মকর্তা। আছে দুই ভাই। মিথিলার বাবা মা দুজনেই আমাকে খুব পছন্দ করে। আমাদের পরিচয়টাও হয়েছিল কাকতালীয়ভাবে। সেদিন শাহাবাগে চলছে তুমুল গন্ডগোল, হরতাল যারা ডেকেছিল তারা রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করছিল। পুলিশের লাঠিচার্জ আর কাঁদুনে গ্যাসের ঝাঁঝালো গন্ধ, ধোঁয়া চারপাশের আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিল। দেশে আাসার পর এ রকম ঘটনা প্রায় দেখে আসছি। রাজনীতি তেমন একট আমাকে টানে না। আমি বুঝি, একটা গণতান্রিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা অনেক । ওরাই পারে দেশে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। শাহাবাগের আন্দোলনের সময় মিথিলা গিয়েছিল পাবলিক লাইব্রেরিতে কিন্তুু হরতালের কারণে কি মনে করে সে আর ভিতরে ঢুকে নাই। ফিরে আসার সময় সে পড়ে যায় আন্দোলন কারীদের মাঝে, পুলিশ ভ্যানে তখন অনেককেই ওঠানো হচ্ছে। হঠাৎ এক পুলিশ মিথিলার হাত ধরে টানতে টানতে ভ্যানগাড়ির দিকে নিয়ে যেতে থাকে। এদিকে মিথিলা বার বার করে বলছে, অফিসার আপনি ভূল করছেন, আমি এই আন্দোলনের সাথে জড়িত নই? আমি পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়েছিলাম, আামার কাছে লাইব্রেরির আইডি কার্ড আছে। পুলিশ তার কথায় কোন কর্নপাত দিচ্ছে না। আমিও ওপাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ করে মিথিলা বলে উঠে ওই যে আমার কাস মেইড? প্লিজ ওকেই জিগ্যেস করুন? আমি তো রীতিমত অবাক। কি করে ভাবলো যে আমি ওকে সহযোগিতা করতে পারি? মনে হলো মেয়েটি নিরাপরাধ, তাকে না হয় একটু সাহায্য করি। এগিয়ে গিয়ে অনেকটা ফিল্ম স্টাইলের হিরোদের মত পুলিশ কে বলেছিলাম, আরে এ কি করছেন পুলিশের ডিআইজি র মেয়েকেই তুলে নিয়ে যাচ্ছেন? এ্যাই আপনি আবার কে? বেশী ঝামেলা করবেন না আপনাকেও গাড়িতে তুলবো। আ রে বিশ্বাস হচ্ছে না তো? দাঁড়ান একটু অপেক্ষা করুন । হ্যালো মামা , তোমার মেয়েকে তো পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে। সে নাকি হরতালের আন্দোলনে ছিল। কি বলছো তুমি জয়? ফোনটা অফিসারকে দাও
ফোনের আলাপচারিতায় বোঝা গেল মামা খুব করে বকুনি দিয়েছে। মিথিলাকে ছেড়ে দিয়ে, মা পর্যন্ত চেয়ে নিল।
আমি চলে যাচ্ছিলাম, পিছনের ডাক শুনে থেমে গেলাম সত্যি এক যাদুকর কন্ঠ, এমন মিষ্টি গলা আর কখনও শুনি নাই, চেহারার মধ্যেও রয়েছে খাঁটি বাঙালির ছাপ। জ্বি বলুন? কেন ডাকছেন? আপনি আমার অনেক বড় উপকার করেছেন। ধন্যবাদ। বাই দ্য ওয়ে… আপনার উপস্থিত বুদ্ধি দেখে আমি তো রীতিমত হতবাক হয়ে গেছি। আমাকে ডিআইজি র মেয়ে বানিয়ে দিলেন?
আপনার নামের সাথে আমার কাজিনের নামের মিল থাকার কারণে এটা সম্ভব হয়েছে, নচেৎ পারতাম না। দু নয়নে কলো মোটা কাজলে দূত্যি ছড়িয়েছে, চেহারার মধ্যে কি যেন একটা আছে, তাকালেই মনটা যেন কেমন করে উঠে। হ্যালো মিঃ কি দেখছেন অমন করে? চলুন এগিয়ে গিয়ে কিছু খাই আর আমরা একে অপরকে ভাল করে চিনি। সেই হতেই শুরু , বছর তিনেক হয়ে গেল এক সাথে বন্ধুত্বের হাতটি শক্ত করে ধরে আছি। মিথিলাদের বাসার সামনে চলে এসেছি। রিফাত নেমেই অজুহাত দেখালো আজ তাকে ছেড়ে দিতে হবে, অন্য একটা কাজের কথা মনে পড়াতে মিথিলাদের বাসায় না ঢুকে চলে গেল। গেটের কাছে আসতেই একটা কল আসলো,, কিন্তুু নাম্বার দেখা যাচ্ছে না। ভাবনার বিষয়। রিসিভ করবে কি করবে না, বেজেই চলছে মোবাইল। নাহ্, অনেকটা কিউরিসিটি নিয়েই ফোন কল রিসিভ করা হলো। ফিসফিস করে হ্যালো বলছে। রাতের সেই কন্ঠ, সে জানতে চাইলো তাকে আমি কেন চিনতে পারছি না। কি বিপদে না পড়লাম। কে এই মানুষটি? কি তার পরিচয় । মিথিলাকে সব কথা খুলে বলে। মিথিলা সাইকোলজী নিয়ে পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বছরই পাস করে বেরুবে। মিথিলা তার রাতের চিন্তাভাবনা এবং কাজগুলো সম্পর্কে জানতে চায়। তারপরে কিছু এডভাইসড্ দিবে। গত রাতের সব কথা তাকে খুলে বললাম। এটাও বললাম যে, সে এমন কিছু কাজ করতে চায়, যেন বিশ্ব বাংলাদেশের কাজগুলো সম্পর্কে জানতে এবং চিনতে পারে। এ দেশে বহু কাজ হচ্ছে। তরুণ সমাজ অনেকদূর এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বাড়ছে।
তাই এমন কিছু করতে চাই যা এখনও কোন বাঙালি তরুণ করে নাই। মিথিলা তাকে বুঝায় এতসব চিন্তা করবে না, আর রাত জাগতে নিষেধ করে। যদি এই অবস্থা আরো কিছুদিন চলতে থাকে তাহলে তাকে ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে হবে।
কফির মগ হাতে নিয়ে দুজনেই সবুজ ঘেরা ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই। কিছু লাভ বার্ড আছে যা অস্বাভাবিক সুন্দর। মিথিলা এত ঘেঁসে দাঁড়িয়েছে যে ইচ্ছে করছে আদরে আদরে ওকে ভরিয়ে দেই। গায়ে মিষ্টি পারফিউম আার চুল হতে শ্যাম্পুর গন্ধ সত্যিই আমাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। এত কাছে হতে মিথিলাকে আমার কখনো দেখা হয়নি। আমি আর একটু এগিয়ে গেলাম , মাথায় দুষ্টুমি চেপে বসলো। পিছন হতে এমনভাবে জড়িয়ে ধরলাম যে আমার মনে হতে লাগলো পৃথিবীর সেরা মুহূর্তটি এখন আমি উপভোগ করছি। সুখ ছন্দে মন শরীর তখন এক আবেগ ঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে ফেলেছে। হঠাৎ মিথিলা নিজেকে আর আয়ত্তে রাখতে পারলো না। আমার জ্যাকেটের নিচে ওর মুখটি দিয়ে আমার বুকের সাথে মিশে গিয়ে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। নাহ্ সবকিছু আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। কে যেন মনের ভিতর হতে বলছে ” কন্ট্রোল ইউর সেলফ্ ” কন্ট্রোল ইউর সেলফ্।
যে কোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। নিজেকে আবেগ মুক্ত করো? এটা শোনার পর, নিজেকে আলতো করে ওর কাছে হতে সরিয়ে নিলাম। কিছুটা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মিথিলা। হয়তো ভাবছে আমার পৌরুষত্ব নিয়ে, কিন্তুু আমি যে, কি কষ্ট করে নিজেকে সামাল দিলাম তা একমাত্র আল্লাহ জানেন। এদিকে হাতের কফি ঠান্ডা হয়ে বরফ। আরেক মগ কফি খেতে খুব ইচ্ছে করছিল কিন্তুু পরিবেশটা পারমিট করছিল না।

মনে হচ্ছিল তাড়াতাড়ি যেতে পারলেই বেঁচে যাই। মিথিলা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে , জরুরি কাজের অযুহাত দেখিয়ে ওদের বাসা হতে বের হয়ে এলাম। গেটের কাছে এসে মোটর সাইকেল টা নিয়ে এক টানে বাসা। দোতলায় উঠতে উঠতে মাথা ঘুরছিল, কোনরকম নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে বিছানায় চলে গেলাম। মনে হচ্ছে কোন রণত্রে হতে পালিয়ে আসা একজন সৈনিক আমি। তারপরও আল্লাহ্ কে ধন্যবাদ যে নিজেকে সংযত রেখে চলে আসতে পেরেছি। মনে পড়ে যায় , প্যারিসের কথা, কলেজের মেয়েরা যেভাবে পিছু নিতো, আর আমি বহুবার নিজেকে সেফ করে চলে আসতাম। সবগুলোই তো ছিল সাদা চামড়ার। জাপানী তারিকুজা বহুবার আমার সাথে বেড রিলেশনশিপ করতে চেয়েছিল কিন্তুু তাকে যখন বললাম, চলো আমরা বিয়ে করি। তখন সে বলেছিল আমি আরও দশ বছর পর বিয়ে করবো। এখন বন্ধু হিসেবে তোমাকে চাই। হায়রে তারিকুজা? আমি কি তোমার হাতের পুতুল যে চাইলেই আমাকে পাওয়া যাবে। বুদ্ধি হবার পর মা একটা কথা বলেছিলেন ” শিক্ষিত হয়তো সবাই হতে পারে কিন্তুু প্রকৃত মানুষ সবাই হয়ে উঠে না ” মা কে বলেছিলাম এটার ব্যাখা দাও? উত্তরে বলেছিলেন সময়ের সাথে সাথে সব বুঝতে পারবে। এখন আমি সব বুঝতে পারি মা? এর পর হতে মেয়েদের এড়িয়ে চলতাম। বিয়ে না করা পর্যন্ত কোন মেয়ের সাথে বন্ধুত্বও করবো না, কিন্তুু এই মিথিলার সাথে কিভাবে যেন জড়িয়ে গেলাম।
মাথার উপরে এই শীতেও ফুল স্পীডে ফ্যান চলছে। সুন্দর আলী দরজায় কড়া নাড়ছে। ভাইসাব আম্মায় আপনারে বুলাই? তাড়াতাড়ি যান দেহি? ঘড়িতে দেখি রাত আট’টা, মা ডিনারের জন্য ডাকছে। খেতে ইচ্ছে করছিল না। মনের আর শরীরের কি এক অদ্ভুদ যোগাযোগ। একটার কিছু হলে অন্যটিও সম ব্যাথায় ব্যথিত হয়। বিছানা ছেড়ে তো উঠতে ইচ্ছায় করছিল না।

বাথরুমে গিয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করার পর মনে হলো, ইয়েস, বেটার লাগছে। ল্যাপটপ টা চার্জ দিয়ে নীচে নামতে লাগলাম। প্রজেক্টএর কাজটা শেষ করতে না পারলে সুবল স্যারের স্বপ্ন আমার স্বপ্ন বৃদ্ধাশ্রম টা গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। আরিক অর্থে আমি বৃদ্ধাশ্রমের পক্ষে কখনই ছিলাম না। একটা শিশু যদি পরম যত্নে মা বাবা র কাছে থাকতে পারে, তাহলে বৃদ্ধা সময়ে মা বাবা কেন সন্তানের কাছে থাকতে পারবে না,কিন্তুু বাস্তবতার চিত্র ভিন্ন। নীচে খাবার টেবিলে গিয়ে দেখি বাবা বসে আছেন। রাতের খাবারে মাছ ভর্তা, ডাল ছিল। সবই আমার প্রিয় খাবার কিন্তুু কিছুই খেতে পারলাম না। বমি বমি লাগছিল, মা এক গ্লাস গরম দূধ এনে দিলেন। দুধটা এক নিঃশ্বাসে খেয়ে উঠতে যাবো ঠিক তখনই বাবা বললেন ” জয় ? কিছু কথা ছিল তোমার সাথে, সময় হবে? তাকিয়ে রইলাম বাবাট দিকে, কোন কথা না বলে চলে এলাম আমার রুমে। মাথা থেকে সব ঝেঁড়ে ফেলে দিয়ে প্রজেক্ট এর কাজটা নিয়ে বসলাম। আমিতো সেই তরুণ, যে সব কিছু ওভারকাম করে এগিয়ে যাবার অদম্য সাহস রাখে। এজন্য সব কৃতিত্ব মায়ের। মা ছোটবেলা হতে যে নৈতিকতার শিক্ষা দিয়ে এসেছেন তা আজও বহন করে চলেছি। মা তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তোমার দোয়া আর শিক্ষা আজও আমাকে সাহায্য করে চলেছে। চোখের কোণে জল এসে যায়। কাঁচের জানালা ভেদ করে স্বচ্ছ নীল আকাশের জ্যোৎস্নার আলো বিছানায় এসে পড়েছে। মনটা ভাল হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়লাম। কাজ করতে করতে রাত তখন প্রায় তিনটা বেজে গেছে। পায়ের মৃদু আওয়াজ, আর ওই মিষ্টি গন্ধ নাকে এসে লাগছে। আজও এরকম হচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে আমার শরীর ঘেঁসে দাঁড়িয়ে আছে। কে তুমি ? কাল রাতেও এসেছিলে, কি চাও আমার কাছে? এখন কান্নার শব্দ পাচ্ছি, অস্ফুট স্বরে বলছে, আমাকে চিনতে পারলে না? আমি তো সেই আমি, তোমার জয়া? ওরা আমাকে তোমার কাছে যেতে দেইনি। আমি আজও এ বাড়িতে তোমার অপোয় আছি। জানো? কেও আমার জন্য একটু আর্শীবাদও করে না। জয়? মনে পড়ছে না আমাকে? ভূত পেত্ব এ আমার ভয় নেই।

এই মেয়েটি কে? নাম বলছে জয়া। এখন ভয়তো এসে ভর করছে। আবার কাজে মনোযোগ দেয়া শুরু করলাম। এখন গানের আওয়াজ পাচ্ছি, একি গানও গাইছে? সাহস নিয়ে বললাম দেখুন, আমাকে সত্যি করে বলুন তো? কি চান আমার কাছে?
আমাকে এই ঘর হতে মুক্ত করতে হবে, আমি আবদ্ধ। ওই পাকিস্তানি হানাদার রা আমার মত হাজারো নারীদের এই বাড়িতে আবদ্ধ করে রেখেছে। তুমিতো জয়? জানো আমার ভালবাসার মানুষটিও জয়। ও, কি জানে না? আমি এখানে আবদ্ধ হয়ে আছি। কেন আমাকে মুক্ত করছে না। আচ্ছা ওই পাকি শয়তান গুলো জয়কে মেরে ফেলেনি তো? আবার কান্নার আওয়াজ, নূপুরের শব্দ ক্ষীণ হয়ে ওই জানালার দিকে এক খন্ড আলো আমার রুম হতে বের হয়ে গেল। জানালার কাছে গিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। নাহ্ চাঁদের আলোর মাঝে ওই টুকরো আলো মিশে কোথায় হারিয়ে গেল। ঘরের মাঝে মিষ্টি গন্ধ এখন পাওয়া যাচ্ছে না। আজ রাতও ঘুম কাজ দুটোই নষ্ট হয়ে গেল। তবে কিছু ক্যু পাওয়া গেছে। ভাবনাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। বাবা এই বাড়িটি কিনেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রায় পাঁচ ছয় বছর পর। যেভাবেই হোক এই বাড়ির আসল মালিক এর সাথে যোগাযোগ করতে হবে। বাবার কাছেই ঠিকানা পাওয়া যাবে। এর একটা সমাধান বের করা খুবই জরুরি। তবে আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। সবাই আমাকে পাগল মনে করবে।তাই কাউকে কিছু বলা যাবে না। কৌশলে বাবার কাছে হতে বাড়ির আসল মালিকের ঠিকানা নিতে হবে। দৌঁড় দিয়ে নীচে নেমে বাবার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দরজা নক করলাম। বাবা দরজা খুলে তো অবাক, কি রে? এত রাতে তুই? কিছু হয়েছে?
কি বলবো বুঝতে পারছি না।
বাবা, ইয়ে মানে? তুমি কি এই শেষ রাতে আমার সাথে মশকরা করতে এসেছো? বাবার ধমক। ছাগল কোথাকার? বিদেশে লেখাপড়া করে একট গাধা হয়েছে। কিছু বলতে না পারলে যাও ঘুমাও?
না, বাবা একটু শোন না? চা খাবে বাবা? মসলা চা? ওই যে প্যারিসে মাঝে মাঝে তোমাকে আর মা কে বানিয়ে খাওয়াতাম। চলো ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসি? বাবা ভাবছে, ছেলেটা আমার কি পাগল হয়ে গেল? এটা কি বেশী লেখাপড়ার সাইডিফ্যাক্ট? ওকে, চলো চা খাবো। বাবাকে বসিয়ে রান্না ঘরে গিয়ে চা বানাতে শুরু করে দিলাম। দু মগ চা নিয়ে এসে বাবার সামনে বসলাম। লং এলাচি, আদা,তেজপাতা, দারুচিনি আাহ্ কি এক দারুণ ফেভার আাসছে। বাবা চা পেয়ে মনে মনে খুশীই হয়েছে। বাবা জানতে চাইলো, আমার কথা। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অনেক কথার পর জানতে চাইলাম, আমরা বাড়ীটা কার কাছে হতে কিনেছি। বাবা বেশ অবাক। ঘটনা পরে বলবো প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঠিকানা টা নিলাম।
পরের দিন খুব সকালে ঘুম হতে উঠে মোটরসাইকেল নিয়ে বাবার দেয়া ঠিকানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। ঢাকা শহরের একটু বাইরে কলাতলী, সেলিম মুন্সীর বাড়ি বললেই সবাই চিনিয়ে দিবে। বাড়িটা তাড়াতাড়িই পেয়ে গেলাম। সবাই সেলিম মুন্সীর নাম শুনলে আঁতকে উঠে। কয়েকজনের কাছে হতে জানতে পারলাম, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নাকি পিচ কমিটির সদস্য ছিলেন। হাজারো বাঙালির মৃত্যুর কারণ আর বহু নারীকে ধরে নিয়ে গিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে পাকি সেনাদের হাতে। ঢাকায় সেলিম মুন্সীর বেশ কয়েকটা বাড়ি ছিল। যেখানে পাকসৈন্যরা বসবাস করতো,আর রাতের আধাঁরে চলতো মদ এবং নারীদের উপর অমানবিক পৈশাচিক নির্যাতন।
গত দুই রাতের ঘটনা এখন আমার কাছে কিছুটা পরিস্কার মনে হচ্ছে। এলাকাতে যখন এসেই গেছি তখন সেলিম মুন্সীর সাথে দেখা করাটা প্রয়োজন মনে করলাম। তাঁর সাথে পরিচয়ে জানতে পারলাম তাঁর ছেলে সাইফুল বাবার বন্ধু ছিল। সেই সুবাধে বাড়িটি বাবার কাছে তারা বিক্রি করে। তবে তাঁর ছেলে কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এলাকায় এই নিয়ে রিউমার আছে যে সবাই বলতো, বাবার অপকর্মের শাস্তি ছেলেকেই দিতে হলো। শয়তান বাবা না মরে, ভাল ছেলেটাই চলে গেল। সেলিম মুন্সীর বয়স এখন প্রায় সত্তর, বয়সের ভারে ন্যূজ হয়ে গেছে। শুনলাম আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধী বিচার ট্রাইবূনালে তাঁর নাম আছে, যেকোন সময় ফাঁসি হয়ে যেতে পারে। ৪৬ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশে কেন এই নরপিশাচ টা এতদিন বেঁচে আছে? কেন এতদিন সে পবিত্র এই মাতৃভূমিতে বিচরণ করছে। রাগে দুুঃখে মনে হচ্ছিল এই বুড়ো শয়তানটাকে আমিই শেষ করে ফেলি। বাসায় ফিরে ফ্রেস হয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে বসলাম। মা তো ভীষণ রেগে আছে, কেন না বলে এত সকালে কোথায় গিয়েছিলাম। মোবাইলটাও রেখে গিয়েছিলাম। মা’র কাছে জানতে চাইলাম, মৃত্যুর পর মানুষের আত্বা কি ঘোরাঘুরি করে? আর কি করলে তারা ভাল থাকে, সেটাও জানতে চাই। মা বেশ আশ্চর্য হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। জানতে চায় আমারর শরীরটা ভাল আছে কি না। আমার কি হয়েছে। মা ইসলামী কিছু রীতিনীতির কথা বলে দিলেন। কোন কিছু দেরী না করেই চলে গেলাম মোড়ের মসজিদের মওলানার কাছে, তিনি সব শুনে মাগরিব নামাযের পর আমাদের বাসায় এসে আমার রুমে চলে এলেন। প্রায় দু্ই ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন দোয়া দরুদ, কোরান তেলাওয়াত এবং জয়া নাম সহ অগনিত নির্যাতিত নারীদের নাম করে মোনাজাত করলেন। আমাকে বললেন, আমি যেন প্রতিদিন রাতে রুমে গিয়ে দোয়া দরুদ পাঠ করি। আমাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ারও উপদেশ দিলেন। অবশ্য মা প্রতিদিন নামাযের তাগিদ দিয়ে আসছেন।

মাওলানা সাহেব চলে যাবার পর, আমার রুম হতে আর বের হওয়া হয়নি। পায়চারী করছি ঘরময়।
অপো করছি জয়ার। রাত গভীর হতে থাকে , আমার উদ্বিগ্ন ও বাড়তে থাকে। কোন সাড়াশব্দ পাচ্ছি না কেন? বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে মিথিলার কথা ভাবতে থাকি, ক’দিন ধরে কথা হচ্ছে না। কাল একবার যাবো। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম মনে নেই। হঠাৎ কে যেন বলছে, ধন্যবাদ জয়, আজ আমি এবং আমরা বহু নারী এই নরক হতে মুক্তি পেলাম। আজ আমি পবিত্র এবং স্বাধীন। কে? কে কথা বলছে? ফজরের আযান ভেসে আসছে। কি এক অচেনা শান্তিতে মনটা আজ ভরে গেল। জয়া আজ স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে।
সৃষ্টি কর্তার অপার মহিমা , সত্যি বোঝা বড় দায়। বাইরে শীতল হাওয়া বইছে, অযু করে এসে জায়নামায নিয়ে বসলাম।

মন্তব্য করুন
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের মরুভূমিতে বন্যা। ছবি: সংগৃহীত
রকমারি3 weeks ago

সৌদি আরবের মরুভূমিতে বন্যা! (ভিডিও)

বিয়ের প্রথম রাতে নারী-পুরুষ উভয়েই মনে রাখবেন যে বিষয়গুলো
সম্পর্ক1 month ago

বিয়ের প্রথম রাতে নারী-পুরুষ উভয়েই মনে রাখবেন যে বিষয়গুলো

আরমান আলিফ
সঙ্গীত1 month ago

সন্দেহ ডেকে আনে সর্বনাশ : আরমান আলিফ

সালমান শাহকে নিয়ে সেই গান প্রকাশ হল
ঢালিউড3 months ago

সালমান শাহকে নিয়ে সেই গান প্রকাশ হল, পরীমনির প্রশংসা

পাকিস্তানের ক্যাপিটাল টিভি চ্যানেলে প্রচারিত টকশোর স্ক্রিনশট। ছবি: সংগৃহীত
ভিডিও3 months ago

সুইডেন নয়, পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ হতে চায় (ভিডিও)

Drink coffee in a tank of thousands of Japanese carp in Saigon
ভিডিও3 months ago

যে রেস্টুরেন্টে আপনার পা নিরাপদ নয় (ভিডিওটি ২ কোটি ভিউ হয়েছে)

ঘাউড়া মজিদ এখন ব্যবসায়ী
টেলিভিশন3 months ago

‘ঘাউড়া মজিদ এখন ব্যবসায়ী’ (ভিডিও দেখুন আর হাসুন)

‘আমরা গরিব হইতে পারি, কিন্তু ফকির মিসকিন না’
বিনোদনের অন্যান্য খবর3 months ago

‘আমরা গরিব হইতে পারি, কিন্তু ফকির মিসকিন না’

রঙ্গন হৃদ্য (Rangan riddo)। ছবি : সংগৃহীত
বিনোদনের অন্যান্য খবর3 months ago

ভাইরাল রঙ্গন হৃদ্যকে নিয়ে এবার সমালোচনার ঝড়

শুভশ্রী গাঙ্গুলী
টলিউড3 months ago

এটাও জানেন শুভশ্রী!

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম