fbpx
Connect with us

গল্প

অবতলে অরণ্য | ম্যারিনা নাসরীন

Published

on

অবতলে অরণ্য  | ম্যারিনা নাসরীন

অবতলে অরণ্য  | ম্যারিনা নাসরীন

শব্দের গা থেকে অক্ষরগুলো খুলে যাচ্ছে। ওরা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে সাদা পাতার বুক জুড়ে। কিলবিল করছে, নাচছে, খেলছে, হাসছে আবার উচ্চস্বরে কাঁদছে, বিলাপ করছে। পরিশেষে কানের পর্দা ভেদ করে গভীরে কোথাও গিয়ে আছড়ে পড়ছে।

দীপা চোখ বন্ধ করে পাশের চেয়ারটিতে বসে। বুকে হাত রেখে মন্ত্র পড়ার মত বিড়বিড় করে,

আমি যা দেখেছি ভুল দেখেছি। আমি চোখ খুলে পুনরায় যেটি দেখব সেটিই সত্য।

দীপা খুব ধীরে চোখ খুলল। প্রত্যেকটা অক্ষর যার যার জায়গায় গায়ে গা সেটে দাঁড়িয়েছে। কালো স্যুট টাই পরা এক সারি ভয়ংকর ভদ্রলোক।

pregnancy test – positive

ডাক্তার যখন প্রেগনেন্সি টেস্ট করতে দিয়েছিল তখনই দীপা প্রতিবাদ করেছিল,

খাওয়ায় সামান্য অরুচির জন্য এই টেস্ট কেন? ইউ নো, শী ইজ আনম্যারেড।

ডাক্তার মুচকি হেসেছিলেন,

ঠিক আছে। নেগেটিভ হলে তো হলই। আপনি আগে টেস্ট করিয়ে আনেন।

প্রায় টলতে টলতে দীপা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে বেরিয়ে আসে। ঘরে ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছে না। হাঁটতে হাঁটতে রবীন্দ্র-সরোবরের সামনে এসে থামে। লেকের টলটলে পানিতে পূর্ণ চাঁদ কেঁপে কেঁপে খন্ডিত হয়ে যাচ্ছে। আশপাশে জোড়ায় জোড়ায় নারী পুরুষ।

আবছা অন্ধকারে ওরা আরও অন্তরঙ্গ। কোথাও অনেক মানুষের গ্রুপ জটলা। সম্মিলিত হাসি তামাসা, হিহি হাহা শব্দ লেকের বাতাসে ভেসে বেশ খানিকটা দূরে চলে যাচ্ছে। কে যেন কিঙ্কর কণ্ঠে গান ধরল ,

আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে…

কাগজটি পুনরায় চোখের সামনে মেলে ধরে দীপা। অস্পষ্ট ছায়া ছায়া লেখার উপর অজিতার মুখটি ভাসছে। কি নিঃপাপ সাদাসিধে মুখ! তোর এই ক্ষতি কে করল বাবুন?

বাড়িতে অনেক পুরুষের আনাগোনা । দীপা কাকে সন্দেহ করবে? প্রায় প্রতি সপ্তাহে গ্রাম থেকে কোন না কোন আত্মীয় এসে রাতে থাকছে। বাসায় দেবর রাতুল, দোতলায় আছে ভাশুরের ছেলে সাদমান, রাব্বিকে পড়াতে আসে বিশ্বজিৎ। ড্রাইভার, দারোয়ান সবার যাতায়াত অবাধ। শাশুড়ি প্রতিদিন বিকালে রুমাকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে যান। রাব্বি ছাড়া অজিতাকে দেখার আর কেউ তখন থাকে না। রাব্বি বাচ্চা ছেলে ও কি বুঝবে? উহ! দীপা আর ভাবতে পারছে না।

বহুক্ষণ থেকে ভাইব্রেশনে মোবাইল কাঁপছে।

মিস কলের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাচ্ছে আট থেকে দশ, দশ থেকে পনের …।

হলুদ রঙের খামের উপর পাশাপাশি দুটি লাল ওয়ান দাঁড়কাকের মত দাঁড়িয়ে আছে। দীপা তর্জনী ছুঁয়ে খামটি ওপেন করে।

দীপা, হোয়ার আর ইউ? প্লিজ পিক ইউর ফোন অর কল মি ব্যাক। আমার খুব টেনশন হচ্ছে, প্লিজ কোথায় কি অবস্থায় আছ, জানাও।

ভাবি, প্লিজ রিসিভ মাই কল। ইফ ইউ আর বিজি, দেন সেন্ড এ এসমসএস।

হাই মা, রাব্বি হিয়ার। কাম হোম সুন, অর কল মি। আই এম ওরিড।

রাব্বির মেসেজের জবাব লেখে দীপা,

আই অ্যাম ফাইন, বাবা। ডোন্ট ওরি। কামিং সুন।

রাত বাড়ছে। চাঁদের নীচে এখনো অনেক মানুষ! দীপা স্পষ্ট দেখতে পায় সোনালী সুতোগুলো তাদের মাথায়, বুকে, শরীরে, কাঁধে জড়িয়ে যাচ্ছে। বিয়ের আগে বহুবার রবীন্দ্র সরোবরের এসব বেদিতে শিহাবের সাথে জ্যোৎস্নায় ভিজেছে। এখনো মাঝে মাঝে আসে। আগের সময়গুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকে। আজ চারপাশে এত মানুষ অথচ কত নিঃসঙ্গ! মানুষ যে আদতে একা, সেটা মাঝে মাঝে প্রত্যেক মানুষই উপলব্ধি করে। আজ দীপার সেই উপলব্ধির দিন।

রাত এগারোটার দিকে ঘরে ফিরলে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে হড়বড় করে অনেক কথা বলে শিহাব।

আচ্ছা দীপা তুমি কি চাও আমি হার্ট অ্যাটাক করে মরি? কোথায় ছিলে? কেন এমন করলে? এত রাত পর্যন্ত  কোনদিন তুমি একা বাইরে থেকেছ, বল? গাড়ী নাওনি । আমি অন্তত: তেত্রিশ জায়গায় ফোন করেছি। রাব্বিকে লেখা তোমার মেসেজ না পেলে হয়ত থানায় যেতাম। এ ছাড়া আমার কি করার ছিল? শিহাবের গলা বুজে আসে।

কিছু সময়ের জন্য দীপা অজিতার রিপোর্টের কথা ভুলে গেল। ওর খুব ক্লান্তি লাগছিল ও চুপচাপ শিহাবের বাড়িয়ে দেওয়া দু হাতের বেষ্টনীর মধ্যে নিজের সমস্ত ভার পরম নির্ভরতায় ছেড়ে দেয়। চোখ দুটো শিহাবের বুক পকেট ভিজিয়ে ফেলছে বোধ হয়।

শিহাব চোখ মুছে দিয়ে চুপিচুপি বলে, যাও হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে খাবার টেবিলে আস। আমরা কেউ এখনো খাইনি।

খাবার টেবিলে রাতুল দীপাকে দেখে হইহই করে ওঠে। ভাবি আজ বিশেষ কারো সাথে ডেটিং ছিল নাকি?

এ ধরণের জোক সে মাঝে মাঝে করে। দীপা হেসে উড়িয়ে দেয়। আজ খুব রেগে গেল।

রাতুল, সভ্য হতে শেখ। সব সময় সব কথা বলা যায় না।

দীপা ঘরে ফেরার পর থেকে শাশুড়ি একটা কথাও বলেননি। গম্ভীর মুখে খাচ্ছেন। দীপার কথা শুনে তিনি বোধ হয় আরও রেগে গেলেন। দ্রুত খাওয়া শেষ করে সজোরে চেয়ার টেনে উঠে পড়লেন। শিহাব খেয়ে ঘরে চলে গিয়েছে । রাতুলের খাওয়া তখনো শেষ হয়নি। দীপা গভীরভাবে রাতুলকে নিরীক্ষণ করছে। অজিতার সাথে ওর প্রতিটা আচরণ মনে মনে ব্যবচ্ছেদ করছে। রাতুল অজিতাকে যথেষ্ট প্রশ্রয় দেয়। ওর জন্য চকলেট চিপস কিনে আনে। অজিতাকে মাঝে মাঝে রাতুলের ঘরে গিয়ে ওর স্বভাব সুলভ আহ্লাদী করতে দেখেছে।

রাতুল, অজিতার সাথে আজ তোমার কথা হয়েছে?

হ্যাঁ হয়েছে তো।

কখন?

এই তো সন্ধ্যায়। ওর জন্য একটা মিস্টার টুইস্ট এনেছিলাম। তোমার বোন কি করল জানো? খুশীতে লাফ দিয়ে প্রায় আমার ঘাড়ে চড়ে বসেছিল।

অজিতা তোমাকে খুব জ্বালায় তাই না?

হাহাহা, তা একটু জ্বালায়।

তোমার বিরক্ত লাগে না?

এভাবে বলছ কেন ভাবি? কেন বিরক্ত লাগবে? ও তো আর দশটা মানুষের মত স্বাভাবিক নয়।

তোমাকে খুব পছন্দ করে। কিন্তু তোমার মত এমন কাঠখোট্টা মানুষকে ও কেন যে পছন্দ করে বুঝি না।

হাহাহা আমি কাঠখোট্টা? বরং বল আমি রসিক রাজা।

হ্যাঁ তাই তো দেখছি। আচ্ছা তুমি খাও আমি উঠছি।

রাতুল বড় চালাক ছেলে। ওকে বোঝা কঠিন। অজিতা আঠার বছরের যুবতী। তার উপর নিজের বিষয়ে লজ্জা বোধ না থাকার কারণে কাপড় চোপড় সামলে চলতে পারে না। এই নিয়ে দুই বোনকে শাশুড়ির কম কথা শুনতে হয়নি। একদিন দীপা আড়াল থেকে শুনল শাশুড়ি রুমাকে বলছে,

রুমা, পাগলীটার শরীরে একটা উড়না পেঁচিয়ে দে।

দীপার আড়ালে অজিতাকে যে উনি পাগলী বলেন সেটা রুমা দীপাকে আগেই বলেছে। কিন্তু এরপরের কথা শুনে দীপার শরীর অসাড় হয়ে গিয়েছিল।

ঘরে আমার অবিবাহিত জোয়ান ছেলে, পাগলীর বুক দেখলে ওর মাথা ঠিক থাকবে?

রুমা বলেছিল, ছি ছি নানী কি বলেন এইসব কথা?

ছি ছি করিস না। বাপেরে শখ করে বিয়ে দিয়ে এখন আমার ঘরটাকে পাগলা গারদ বানিয়ে ফেলেছে। তখন বারবার করে বলেছিলাম দীপা, বেয়াই সাহেবরে বিয়ে দিও না। তোমাদেরকে রাস্তায় নামিয়ে দেবে। হল তো? এখন বুড়া পাগল মেয়েটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে কচি বৌ নিয়ে হানিমুন করছে। ছি!

শাশুড়ি মিথ্যা বলেননি ।

দীপা প্রায় জোর করে বাবার বিয়ে দিয়েছিল। মা মারা যাবার পর বাবার খাওয়া দাওয়ার সমস্যা। কাজের লোকের হাতে সে খাবে না। তাতে নাকি তার পেটে আলসার হয়ে যাবে। দীপার চাকরি, সন্তান, শাশুড়ি-দেবর নিয়ে সংসার। সে বাবাকে প্রতিদিন কিভাবে রান্না করে দিয়ে আসবে? মিরপুর থেকে সেই হাজীপাড়ায় হররোজ যাওয়া আসা তো চাট্টিখানি কথা নয়। সেখান থেকে ঘরে ফিরতে দেরী হলে শাশুড়ির কালো মুখ, দেবরের কথার হুল। তাছাড়া বাবা অফিসে গেলে অজিতাকে দেখবে কে?

দীপার উদ্যোগেই কলিগ মনোরমার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের সাথে বাবার বিয়ে হয়ে গেল। ভদ্রমহিলা ডিভোর্সড। নিঃসন্তান। সন্তান হবার সম্ভাবনাও নেই। কিন্তু বিয়ের ছয় মাসের মধ্যে দীপা বুঝতে পারল কত বড় ভুল সে করেছে। বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী ততদিনে পুরো ভোল বদলে ফেলেছে। ওদিকে অজিতার পাগলামি বাড়তে থাকে। একদিন সে সাফ জানিয়ে দিল অজিতার মত পাগলের সাথে সে এক ঘরে বাস করতে পারবে না। হয় অজিতাকে মানসিক হাসপাতালে পাঠাতে হবে অথবা তাকে তালাক দিতে হবে। কি অদ্ভুত! যে বাবা দীপার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পিতা ছিল সে কবে কবে বিমাতার স্বামী হয়ে গিয়েছে দীপা জানেই না। বাবা যখন অজিতাকে মানসিক হাসপাতালে নেবার তোড়জোড় করছে তখন দীপা শিহাব বা শাশুড়ি কারো অনুমতি না নিয়েই অজিতাকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিল।

ভদ্রসমাজের মধ্যবিত্ত পরিবার। মুখ ঝাঁকিয়ে ঝগড়া তো শোভা পায় না। তাছাড়া দীপা বেকারও নয়। শাশুড়ি কোনমতে কাষ্ঠ হাসি হেসে বলেছিলেন,

বোন বোনের বাড়িতে থাকবে তাতে আমার কি বলার আছে?

শিহাব বলেছিল,

তোমার বোন কি আমার বোন নয়? ও আমাদের কাছেই থাকুক।

রাত গভীর হয়। শিহাবের ভারী নি:শ্বাস গায়ে এসে লাগছে। দীপার ঘুম নেই। ও আলগোছে উঠে অজিতার ঘরের দিকে এগোয়।

অজিতা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। দুই হাত বুকের মধ্যে এক করা। পা দুটোও ভেঙে হাতের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছে। জিরো পাওয়ারের নীলচে আলোয় ঘরের সবকিছু আবছা নীলাভ। দীপা ওর পাশে বসে আলতো করে মুখ উপর থেকে চুল সরায় । ধবধবে সাদা মুখটাও নীল দেখাচ্ছে। নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা যে মেয়েটিকে দেওয়া হয়নি তাকে এমন পরীর মত সুন্দর করে বিধাতা কেন পাঠিয়েছেন সে তিনি ভাল জানেন।

দেওয়ালে কাঠের ফ্রেমে মা হাসছে। দুইবছর আগে মায়ের বিয়ে বার্ষিকীর দিনে শিহাব তুলেছিল। এটাই বোধ হয় তার শেষ ছবি। অজিতা কত জিনিস ভাংচুর করে কিন্তু মায়ের এই ছবিটা কখনো ধরেনি। ওকে বাড়ি থেকে নিয়ে আসার দিন দীপা এই ছবিটিও সাথে করে এনেছিল। অজিতা মাঝে মাঝে ছবিটির দিকে নি¯পলক তাকিয়ে থাকে। বিনবিন করে। ঠোঁট নড়ে। কিন্তু ভাষা পায় না। চোখ উপচায়! হয়ত ইথারে ইথারে ভেসে যায় কান্না। দীপা, বাবা কেউ সেই কান্নার শব্দ শোনে না। লোকান্তরে বসে মা কি মেয়েকে শুনছে?

অজিতার যখন জন্ম হয় দীপার বয়স তখন দশ বছর। ও যে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী সেটা পাঁচ বছর বয়স থেকেই বোঝা গিয়েছিল। ওর আচরণ আর দশটি স্বাভাবিক শিশু থেকে একদম আলাদা ছিল। যত বড় হয়েছে অস্বাভাবিকতা ক্রমেই বেড়েছে। বুদ্ধির লেভেল পাঁচ ছয় বছর বয়সী শিশুদের মত তবে বদ্ধ উন্মাদ নয়। বাইরের কেউ হঠাৎ দেখলে বুঝবে না যে অস্বাভাবিক। বাবা চিকিৎসার জন্য ডাক্তার, পীর, ফকির কিছুই বাদ দেয়নি। ইন্ডিয়াতেও নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু লাভ হয়নি। ওষুধের ক্রিয়ায় দিনের অনেকটা সময় অজিতা ঘোরের মধ্যে থাকে। এই ঘোর কালীন সময়ের সুযোগ কোন পাষ- নিয়েছে কে জানে!

এই সমাজে যে পরিবারে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মেয়ে শিশু জন্মায় সে পরিবার জানে সামনের দিনগুলিতে কি কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। এসব শিশু চিরশিশু থাকে না । একদিন তারা নারী হয়ে ওঠে। তার বুদ্ধি না থাকুক শরীর থাকে এবং সমাজের অনেক পুরুষের কাছে নারী মানে একতাল মাংস। তারা নারীর শরীর দেখে, বুদ্ধি মাপে না। অজিতার গানের গলা চমৎকার। শুনে শুনে সঠিক তাল লয়ে গাইতে পারে। মা ভেবেছিল কিছু না হোক, গান গেয়ে চলতে পারবে। মধ্যবয়স্ক একজন ওস্তাদ সপ্তাহে দুইদিন বাসায় এসে গান শিখিয়ে যেত। একবার অজিতা গান শেখার সময় খিলখিল করে হাসছিল। ওস্তাদ চলে যাবার পর মা বলল,

অজি এত হাসছিলে কেন?

অজিতা হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ল,

আম্মু আম্মু ওস্তাদজি আমাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল হাহাহা হিহিহি।

মা ভয়ংকর ভীত চোখে বলল,

কোথায় সুড়সুড়ি দিয়েছে?

ও মায়ের হাত টেনে নিয়ে বুকে রেখে বলল,

এখানে।

ওর বয়স তখন চৌদ্দ বছর।

সেবার মা অজিতাকে প্রচুর মেরেছিল,

তুই মরিস না ক্যান? মর। আমি বিষ এনে দিচ্ছি সেটা খেয়ে মর।

অজিতাকে কেন মারা হচ্ছে সেটা সে কিছুই বুঝল না শুধু চীৎকার করে দীপাকে ডাকছিল,

বাবুন, বাবুন, মা আমাকে মারছে।

সে পেতল সময়ে মায়ের হাত থেকে বোনকে বাঁচানোর কোন বীরাঙ্গনা সাহস দীপার ছিল না। হুমহাম করে অজিতা বড় হতে থাকে। ওর সাবালকত্বে বিছানা বালিশ রঞ্জকে মাখামাখি। ঈশ্বর যে ওকে কোন কিছুই গোপন করতে শেখায়নি! মা প্রায়ই আকাশের দিকে মুখ করে অদৃশ্য কারো উদ্দেশ্যে অভিযোগ জানাত,

কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছ আমাকে? হয় ওকে তুলে নাও অথবা আমাকে এই যন্ত্রণা থেকে রেহায় দাও।

আল্লাহ মায়ের প্রার্থনা শুনেছেন। তাঁকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। হঠাৎ একদিন গভীর রাতে বাবার ফোন পেয়ে হাসপাতালে ছুটে গিয়ে দীপা দেখল মায়ের আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে ঢাকা। ডাক্তার বলেছিল ব্রেন হেমারেজ।

অজিতা পাশ ফেরে। দীপা ওর মুখের কাছে মুখ নেয়। কপাল কুঞ্চিত। ঠোঁটে সুস্পষ্ট কান্না। কি কষ্ট রে বাবুন! অজিতা নিঃসাড়।

কিছুক্ষণ পরেই ভোর হবে। দীপা ঘরে ফিরে শিহাবের গা ঘেঁষে শুয়ে পড়তেই শিহাব ওকে বুকের ভেতর আটকে ফেলে। কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলে,

এই দিপু, বলত কি হয়েছিল?

সারাদিনে জমতে জমতে যে মেঘ ভারী হয়ে এসেছিল উষ্ণস্পর্শ পেয়ে সেগুলো ঝরঝর করে ঝরে পড়ে। দীপা শিহাবের বুকে মুখ গুঁজে হুহু করে কাঁদছে।

লক্ষ্মী মেয়ে কাঁদে না। আমাকে বল কি হয়েছে?

দীপা উঠে চোখ মোছে। লাইট জ্বেলে রিপোর্টটি শিহাবের হাতে দেয়।

শিহাবের হাত কাঁপছে।

অসম্ভব। টেস্টে কোথাও ভুল আছে। ওর শরীরে তো কোন সিমটম নেই। তাছাড়া কার এতবড় সাহস হতে পারে? আল্ট্রাসনোগ্রাম করিয়েছ? ইউরিন টেস্টে বিশ্বাস নেই।

ওটার সময় এখনো হয়নি। তবে আমি ভাল করে চেক করেছি রিপোর্ট ঠিক আছে।

আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না দীপা।

আমার বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে না শিহাব। বাবাকে কি জবাব দেব? এ বাড়িতে অনেক পুরুষের আসা যাওয়া। এরমধ্যে বাড়ি থেকে রবিন, জাহাঙ্গীর, রহমান এরা এসে কয়েকদিন থেকে গিয়েছে। কতবার বলেছি সব মানুষকে এভাবে বাসায় আনবে না। তুমি শোন না। কেন, ঢাকায় হোটেল নেই?

আহা, ওরা তো আমার পর নয় চাচাত ফুপাত ভাই। বাসায় দুই একদিন থাকতে চাইলে চলে যেতে বলি কিভাবে? তবে আমার মনে হয়না ওদের এত সাহস হবে।

শোন, রাতে পুরুষ পুরুষ থাকে না হায়েনা হয়ে যায়। অজিতার রুম লক করা হয় না। সুযোগ কেউ অবশ্যই নিয়েছে। আমার তো রাতুলকেও সন্দেহ হয়।

কি বলছ তুমি? কক্ষনো না। কেন অজিতা কিছু বলেছে?

ও কি বলবে? ও তো পাঁচ বছরের শিশুর মত শুধু আদর বুঝে। কোনটা ভাল কোনটা মন্দ আদর সে জ্ঞান যদি থাকত তাহলে এই দিন কেন দেখতে হবে?

চিন্তা করো না । কালপ্রিটকে আমি খুঁজে বের করবই। কিন্তু তার আগে একটা কাজ করতে হবে দীপা।

কি?

ওর এবরশান করাতে হবে।

না আমি এবরশান করাব না। কে এই কাজ করেছে সেটা আগে বের করব। তার সাথে বিয়ে দেব। ওর সন্তান হবে। সেই যেই হোক। তোমার ভাই রাতুল হলেও।

পাগলের মত কথা বলো না। জানাজানি হলে মুখ দেখাতে পারব? কতজনের চোখ বন্ধ করে রাখবে?

তুমি না পারলেও আমি পারব।

মা রাজী হবেন না।

না রাজী হন আমি আমার বোনকে নিয়ে চলে যাব।

উহ! সেই জিদ। এই জিদই তোমাকে শেষ করে ফেলল। এই জিদের বসে তুমি অজিতাকে এ বাসায় এনেছ। আমাদের কাছে একবার জানতে পর্যন্ত চাওনি। শিহাব সজোরে দরজা খুলে সিগারেট লাইটার হাতে বারান্দায় চলে যায়। যা মন চায় কর আমি এসবের মধ্যে নেই।

দীপার চোখ আবার ভরে ওঠে। একেক সময় মানুষ একা। দীপাও একা।

দিন যায়। রিপোর্ট পাবার পর পনের দিন কেটে গিয়েছে। দীপার পুরো জীবন এলোমেলো। অফিস, বাসা কোথাও সুস্থির হতে পারছে না। বাবা থেকেও নেই। তাকে এখনো কিছু জানায়নি। সাদমান, বিশ্বজিৎ, এমনকি জলিলকে পর্যন্ত নানা ভাবে কোয়ারি করেছে। ড্রাইভার কিছু একটা বলতে গিয়েও বলছে না। অজিতার শরীরে মা চিহ্ন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ওর তলপেট ভারী। শাশুড়ি বয়স্ক মানুষ, তাঁর কাছে আর লুকানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। অজিতাকে কেন এ বাড়িতে নিয়ে এসেছে সেই নিয়ে দিনরাত শাপশাপান্ত চলছে। পুরো দোষ যেন দীপার। এবরশানের জন্য মা ছেলে দুজনেই দীপাকে প্রচণ্ড চাপ দিচ্ছে।

সেদিন দুপুরে দীপা অজিতার সাথে পুতুল খেলার ছলে জিজ্ঞেস করেছিল,

বাবুন তোমাকে কে কে আদর করে বলত?

বাবুন, বাবা, দুলাভাই। ওরা দুজন দুজনকে বাবুন বলে ডাকে।

রাতুল ভাইয়া, সাদমান ওরা করে না?

হু রাতুল ভাইয়া চকলেট এনে দেয়। সাদমান পচা, খামছি দেয়। রবিন ভাইয়া ভাল আমাকে আইস্ক্রিম দেয়।

রবিন ভাইয়া তোমাকে অনেক আদর করে?

হু করে তো।

আচ্ছা তোমাকে রবিন ভাইয়া যেভাবে আদর করে সেভাবে তোমার বুনবুন পুতুলকে আদর কর তো।

দীপা বিস্মিত হয়ে দেখল, পুরুষের হাত যেমন নারী শরীরের আনাচে কানাচে ঘোরে অজিতার হাত ঠিক সেইভাবে নারী পুতুলটির মাথা, মুখ ঠোঁট বুক সহ পুরো শরীরের অলিতে গলিতে ঘুরছে।

উফ! রবিন!

শিহাব এখনো বাসায় ফেরেনি রাতুল বাসায় ঢোকার কিছুক্ষণ পরে দীপা ওর ঘরে যায়।

রাতুল তোমার সাথে একটা বিষয় শেয়ার করতে চাচ্ছি।

কি বিষয় বলত?

দীপা কিছুসময় চুপ করে থেকে বলে,

তুমি হয়ত জানো না অজিতা প্রেগন্যান্ট।

কি বলছ ভাবি? রাতুলের সমস্ত শরীরে ঝাকুনি দিয়ে ওঠে।

হু ইজ দিস কালপ্রিট? ভাবি আমাকে সন্দেহ করছ না তো?

প্রথমে তোমাকে সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু এখন অজিতার কাছে শুনে যেটা বুঝলাম কালপ্রিট অন্য কেউ।

আমাকে সন্দেহ করেছ? আমি ওকে বোনের মত দেখি ভাবি। অজিতা কার কথা বলেছে?

রবিন।

ওহ! আমি ভাইয়াকে বলেছিলাম ওই স্কাউন্ড্রেলকে বাসায় ঢুকতে না দিতে।

রাতুল, আমি ঠিক করেছি রবিনের সাথেই অজিতাকে বিয়ে দেব।

কেন বিয়ে দেবে? ওকে জেলে ভরব। দাঁড়াও, আমি বিষয়টা দেখছি। ভাইয়াকে এখনই কিছু বোলো না।

এই রবিনকে দীপা নিজের ভাইয়ের চোখে দেখে। কতদিন রান্না করে খাইয়েছে। আচমকা একরাশ ক্লান্তি দীপাকে আষ্টে-পিষ্টে আঁকড়ে ধরে। ও টলতে টলতে বিছানায় এসে শোয়। কত যুগ শুয়ে আছে কে জানে। আচমকা মনে হল বিছানা থেকে পা হড়কে ও একটা খাদে পড়ে গিয়েছে । ও তলিয়ে যেতে থাকে গভীর থেকে গভীরে। দুটো নরম হাত দীপাকে জড়িয়ে ধরে , মা !!

এত চিন্তা করছিস কেন মা? ওঠ, দেখ আমি এসেছি সব ঠিক হয়ে যাবে।

মা কেন এমন হল?

দীপা, তোমাকে আমি বলেছিলাম অজিতার জন্য এই পৃথিবী নয়। দেখলে তো। আমি ওকে আমার কাছে নিয়ে যাব সেখানে ও ভাল থাকবে। তুমি ভেব না। ওঠ তাকাও আমার দিকে।

দীপা চোখ খোলে কিন্তু মা কোথায়? চারদিকে খোঁজে। বিছানায় শিহাবের জায়গাটা খালি। হয়ত বারান্দায়। দীপা অজিতার রুমের দিকে যায়।

ঘুম ভেঙে যাবে ভেবে সন্তর্পণে দরজা খোলে। হালকা নীলাভ আলোয় দুটো নারী-পুরুষের অবয়ব পাশাপাশি। একজন অজিতা, অন্যজন?

উহু আমি ওষুধ খাব না। ওগুলো পচা আমি বমি করব।

লক্ষী মেয়ে খেয়ে নাও এটুকু শুধু।

তাহলে আমাকে আদর করবে তো?

তোমাকে তো আমি রোজ রাতে অনেক অনেক আদর করি। করি না?

কর তো।

আচ্ছা আমি তোমাকে আদর করি সেটা কি তোমার বাবুনকে বলেছ?

হ্যাঁ বলেছি তো।

সর্বনাশ! কি বলেছ?

তুমি আদর কর, বাবুন আদর করে, বাবা আদর করে।

কিভাবে আদর করি সেটা বলেছ?

উহ! দুলাভাই একটা পাপ্পি দাও।

আহা এখন নয়। আগে ওষুধটা খেয়ে নাও অনেকগুলো পাপ্পি দেব।

শিহাবের ওষুধ ধরা হাতটি অজিতার মুখের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

চির চেনা অবতলে এ কোন গহীন অরণ্য! দীপা দরজার চৌকাঠ আঁকড়ে ধরে। পৃথিবী দুলে ওঠে। ওর চোখের সামনে সবকিছু উল্টো হয়ে ঝুলছে, শিহাব, অজিতা, ঘর বাড়ি …কাঠের ফ্রেমে মা।

মন্তব্য করুন
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের মরুভূমিতে বন্যা। ছবি: সংগৃহীত
রকমারি3 weeks ago

সৌদি আরবের মরুভূমিতে বন্যা! (ভিডিও)

বিয়ের প্রথম রাতে নারী-পুরুষ উভয়েই মনে রাখবেন যে বিষয়গুলো
সম্পর্ক1 month ago

বিয়ের প্রথম রাতে নারী-পুরুষ উভয়েই মনে রাখবেন যে বিষয়গুলো

আরমান আলিফ
সঙ্গীত1 month ago

সন্দেহ ডেকে আনে সর্বনাশ : আরমান আলিফ

সালমান শাহকে নিয়ে সেই গান প্রকাশ হল
ঢালিউড3 months ago

সালমান শাহকে নিয়ে সেই গান প্রকাশ হল, পরীমনির প্রশংসা

পাকিস্তানের ক্যাপিটাল টিভি চ্যানেলে প্রচারিত টকশোর স্ক্রিনশট। ছবি: সংগৃহীত
ভিডিও3 months ago

সুইডেন নয়, পাকিস্তান এখন বাংলাদেশ হতে চায় (ভিডিও)

Drink coffee in a tank of thousands of Japanese carp in Saigon
ভিডিও3 months ago

যে রেস্টুরেন্টে আপনার পা নিরাপদ নয় (ভিডিওটি ২ কোটি ভিউ হয়েছে)

ঘাউড়া মজিদ এখন ব্যবসায়ী
টেলিভিশন3 months ago

‘ঘাউড়া মজিদ এখন ব্যবসায়ী’ (ভিডিও দেখুন আর হাসুন)

‘আমরা গরিব হইতে পারি, কিন্তু ফকির মিসকিন না’
বিনোদনের অন্যান্য খবর3 months ago

‘আমরা গরিব হইতে পারি, কিন্তু ফকির মিসকিন না’

রঙ্গন হৃদ্য (Rangan riddo)। ছবি : সংগৃহীত
বিনোদনের অন্যান্য খবর3 months ago

ভাইরাল রঙ্গন হৃদ্যকে নিয়ে এবার সমালোচনার ঝড়

শুভশ্রী গাঙ্গুলী
টলিউড3 months ago

এটাও জানেন শুভশ্রী!

সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : তাহমিনা সানি
প্রকাশক : রামশংকর দেবনাথ
বিভাস প্রকাশনা কর্তৃক ৬৮-৬৯ প্যারীদাস রোড, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০ থেকে প্রকাশিত।
ফোন : +88 01687 064507
ই-মেইল : rupalialo24x7@gmail.com
© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | রূপালীআলো.কম